
গাজীপুরের প্রায় ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ শিল্পকারখানায় গ্যাস-সংকটের কারণে টানা তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
এতে বুধবার সকাল থেকেই ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ঘরমুখো শ্রমিকদের ভিড় বেড়েছে। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে বাস সংকট, যানজট ও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের সুপার মো. আমজাদ হোসেন জানান, বুধবার ও শুক্রবার সরকারি ছুটি থাকায় মাঝখানের বৃহস্পতিবার ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ শিল্পকারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে টানা তিন দিনের ছুটি পেয়ে গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেন হাজার হাজার শ্রমিক।
তিনি বলেন, “মঙ্গলবার অফিস শেষে অনেক শ্রমিকই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। আর বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গাজীপুরের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে ঘরমুখো শ্রমিকদের ব্যাপক চাপ দেখা যায়।”
এদিকে টানা তিন দিনের ছুটিকে কেন্দ্র করে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা, চন্দ্রা ত্রিমোড়, সফিপুর, কোনাবাড়ী ও শ্রীপুরের মাওনা চৌরাস্তাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঈদের মতো ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখা গেছে।
যাত্রীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় লোকাল বাসও দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহন করছে। তবে লোকাল বাস না পেয়ে অনেক যাত্রী সিএনজিচালিত ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন।
গাজীপুর দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল। জেলায় কয়েক হাজার তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্পিনিং, নিটিং, ডাইং, ওয়াশিং, সিরামিক, ওষুধ, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানা রয়েছে।
শিল্প পুলিশ বলছে, তীব্র গ্যাস-সংকটের কারণে যেসব শিল্পকারখানা চার দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অনেক কারখানা সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বুধবার চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ভাওয়াল মির্জাপুর মাস্টারবাড়ি এলাকায় যাওয়ার জন্য আবুল কালাম নামে এক যাত্রী তাকওয়া সার্ভিসের একটি লোকাল বাসে উঠতে পারেননি। পরে বাধ্য হয়ে তিনি প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে অটোরিকশায় উঠে বসেন।
আবুল কালামের মতো অনেকেই বাসে উঠতে না পেয়ে বিকল্প গাড়িতে করে গন্তব্যে রওনা হন। অনেকে বাসে সিট পেলেও দিগুন ভাড়ায় যেতে হয়েছে।
বুধবার সকাল ৯টায় চন্দ্রা এলাকায় কথা হয় গোমতী টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিক কফিল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, “কাজ না থাকলে কারখানায় বসে থাকার চেয়ে কয়েক দিনের জন্য বাড়ি যেতে পারাটা ভালো। তবে দ্রুত গ্যাস-সংকটের সমাধান হোক এবং কারখানাগুলো আবার পুরোপুরি চালু হোক।”
গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (ট্রাফিক) এসএম আশরাফুল আলম জানান, মঙ্গলবার বিকাল থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানজট শুরু হয়। বিকাল ৫টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত মহাসড়কে গাড়ির লম্বা লাইন ছিল। এছাড়া বুধবার ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত যাত্রী ও যানবাহণের চাপ ছিল।
কোনাবাড়ী হাইওয়ে পুলিশের পরিদর্শক জাফর আলী বলেন, “জেলার অনেক কারখানায় সরকারি ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে টানা তিন দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছুটি পেয়ে শ্রমিকরা গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন।
“মঙ্গলবার রাত থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় যানবাহনের চাপ বেড়েছে। বুধবার সকালেও শত শত মানুষ ও যানবাহনের ভিড়ে এ এলাকায় থেমে থেমে যান চলাচল করছে।”
গাজীপুরের ভোগড়া চৌরাস্তার স্টাইলিশ গার্মেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও তরুণ শিল্পউদ্যোক্তা মো. সালাউদ্দিন চৌধুরী বলছেন, “অব্যাহত গ্যাস-সংকটের কারণে দিন দিন রপ্তানি আদেশ কমে যাচ্ছে। ক্রেতারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। এ সংকট দীর্ঘায়িত হলে তৈরি পোশাকশিল্প ঝুঁকির মুখে পড়বে।
“গ্যাস-সংকটের কারণে সরকারি ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে কর্মীদের তিন দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে। আশা করি, সরকার এ সময়ের মধ্যে গ্যাস-সংকটের সমাধান করবে।”
গাজীপুর তিতাস কর্তৃপক্ষ বলছে, জেলায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় সাড়ে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতির কারণেই শিল্পাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় প্রয়োজনীয় চাপ বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে সকাল ও দিনের বেলায় উৎপাদন সবচেয়ে বেশি ব্যাহত হচ্ছে।
গাজীপুরে তিতাস গ্যাসের সিস্টেম অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখার ব্যবস্থাপক মো. সাইফুজ্জামান বলেন, “জেলায় বর্তমানে প্রায় ৪৫ শতাংশ গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। গ্যাসের স্বল্প চাপের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছে কালিয়াকৈর, শ্রীপুর ও টঙ্গী বিসিক শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো। গ্যাস-সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় কাজ চলমান রয়েছে।”
কোনাবাড়ী এলাকার ‘পিএন কম্পোজিট’ কারখানার ব্যবস্থাপক সাংবাদিকদের বলেন, “গ্যাস-সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের রপ্তানি খাত বড় ধরনের চাপে পড়বে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”