1. editor@purbobabgla.net : Web Editor : Web Editor
  2. admin@purbobangla.net : purbabangla :
  3. jashad1989@gmail.com : Web Editor : Web Editor
​ গণতন্ত্র কি শুধু ভোট দেওয়ার নাম? - পূর্ব বাংলা
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:৪২ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
ডেমোক্রেটিক লীগের ৫০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ২২ শে সেপ্টেম্বর ​ গণতন্ত্র কি শুধু ভোট দেওয়ার নাম? ঈদগাঁওতে ৮শত ইয়াবাসহ বাসচালক গ্রেপ্তার ডিমে ডজনে কমল ১০ টাকা, মাছ-মুরগিতে ফেরেনি স্বস্তি ঈদগাঁওয়ের শিক্ষা বিস্তারের অনন্য বাতিঘর মাস্টার মোজাম্মেল হক ফরাজী ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন মূল্যস্ফীতি আগস্টে ঠান্ডা মিয়ার গরম কথা ( ৩৬৪ ) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সমীপে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সিজেএ বাংলাদেশের নেতাদের সাক্ষাৎ রুদ্রজ ব্রাহ্মণ (নাথ) স¤প্রদায়ের ব্রাহ্মণ বর্ণ এবং গোত্র ব্যবস্থার প্রামাণিক তথ্য পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ঘিরে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ ‘কন্ট্রাক্টে’ পাসপোর্ট করে দেওয়ার আশ্বাস, অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ; দালালদের তৎপরতা অস্বীকার কর্তৃপক্ষের

​ গণতন্ত্র কি শুধু ভোট দেওয়ার নাম?

পূর্ব বাংলা ডেস্ক
  • প্রকাশিত সময়ঃ শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১০ বার পড়া হয়েছে

একটি দার্শনিক অনুসন্ধান: সংখ্যার রাজনীতি থেকে মর্যাদার রাজনীতি
জহিরুল ইসলাম
​প্রতিটি নির্বাচনের মৌসুমে আমরা একটি চিত্র দেখতে পাই: লাইনে দাঁড়ানো মানুষ, হাতে ব্যালট পেপার, আঙুলে কালির ছাপ। এই দৃশ্যটি এতটাই শক্তিশালী যে আমরা প্রায়শই ধরে নিই—এই ছবিটি আঁকা হলেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। কিন্তু একটি প্রশ্ন যদি করি: যে ব্যক্তি ভোট দিতে পারল, সে কি সত্যিই নিজের রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারল? ভোট দেওয়ার অধিকার আর গণতান্ত্রিক নাগরিক হয়ে ওঠা—এই দুটি কি আসলে একই বিষয়?
​এই প্রশ্নটি সরল মনে হলেও এর উত্তর আমাদেরকে এমন এক যাত্রায় নিয়ে যায়, যেখানে গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ উন্মোচিত হয়।
ভোট কেন এত গুরুত্বপূর্ণ—আর কেন এতটাই কম?
​ভোট গণতন্ত্রের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ। কারণ এটি একটি সরল, পরিমাপযোগ্য ও সর্বজনীন কর্ম—যার মাধ্যমে নাগরিক সরাসরি ক্ষমতার বিন্যাসে অংশ নেয়। নির্বাচন ছাড়া একটি ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলা যায় না; এটি গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত। কিন্তু শর্ত আর সম্পূর্ণ সংজ্ঞা এক নয়।
​রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল গণতন্ত্রের যে আদর্শ মডেলটি প্রস্তাব করেন—যাকে তিনি ‘পলিআর্কি’ বা ‘বহুশাসন’ নামে অভিহিত করেছেন—সেখানে তিনি আটটি প্রাতিষ্ঠানিক গ্যারান্টির কথা বলেন: ১) সংগঠন গঠন ও তাতে যোগদানের স্বাধীনতা, ২) মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ৩) সর্বজনীন ভোটাধিকার, ৪) জনসেবার জন্য যোগ্যতা, ৫) নেতাদের সমর্থন প্রতিযোগিতার অধিকার, ৬) তথ্যের বিকল্প উৎস, ৭) অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং ৮) সরকারি নীতি নির্ধারণে ভোটের নির্ভরশীলতা। লক্ষ্য করুন—ভোট এই আটটি গ্যারান্টির মধ্যে মাত্র একটি। বাকিগুলো ছাড়া ভোটের অর্থ কী?
​ডাল নিজেই সতর্ক করেছিলেন, “গণতন্ত্র” শব্দটি মূলত গ্রিসের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের স্মৃতি বহন করে, যা আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থায় অসম্পূর্ণভাবে রূপায়িত। তাই বাস্তব ব্যবস্থাগুলোকে তিনি “পলিআর্কি” বলতে পছন্দ করতেন—অর্থাৎ, এমন একটি ব্যবস্থা যা আদর্শ গণতন্ত্রের কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করে, কিন্তু কখনোই পুরোপুরি পৌঁছায় না।
নির্বাচনী গণতন্ত্র বনাম উদার গণতন্ত্র
​আধুনিক রাজনৈতিক তত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে—’নির্বাচনী গণতন্ত্র’ এবং ‘উদার গণতন্ত্র’-এর মধ্যে। নির্বাচনী গণতন্ত্র হলো সর্বনিম্ন সংজ্ঞা: নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন, যেখানে ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটে। অন্যদিকে উদার গণতন্ত্র নির্বাচনের বাইরে গিয়ে ব্যক্তির অধিকার, সংখ্যালঘুর সুরক্ষা, আইনের শাসন এবং ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা নিশ্চিত করে।
​ফরিদ জাকারিয়া ১৯৯৭ সালে ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এ প্রকাশিত এক প্রভাবশালী প্রবন্ধে এই পার্থক্যটি তুলে ধরেন। তিনি দেখান, বিশ্বের বহু দেশে নির্বাচিত সরকারগুলো নিয়মিতভাবে নিজেদের ক্ষমতার সীমা উপেক্ষা করছে এবং নাগরিকের মৌলিক স্বাধীনতা খর্ব করছে। জাকারিয়া এই ঘটনাকে ‘অন্যায় গণতন্ত্র’ (Illiberal Democracy) নামে অভিহিত করেন—যেখানে অবাধ নির্বাচন থাকলেও সাংবিধানিক উদারতাবাদ অনুপস্থিত।
​এই ভ্রান্তিটি বিপজ্জনক, কারণ এটি কর্তৃত্ববাদী শাসনকে গণতান্ত্রিক মোড়কে লুকিয়ে রাখার সুযোগ দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আন্দ্রেয়াস শেডলার-এর ভাষায়, নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদের বৈশিষ্ট্য হলো—নির্বাচনের আয়োজন থাকলেও, নির্বাচনের মাঠটি এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে প্রকৃত প্রতিযোগিতা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা
​এখানেই আসে সবচেয়ে জটিল দার্শনিক প্রশ্নটি: সংখ্যাগরিষ্ঠের রায় কি সংখ্যালঘুর অধিকার খর্ব করার বৈধতা দেয়? রাজনৈতিক তত্ত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসনের নীতিটি ন্যায়সঙ্গত, কারণ এটি রাজনৈতিক সমতার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু সমস্যা হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠতা যদি অত্যাচারে পরিণত হয়, তাহলে সেই ব্যবস্থা আর গণতন্ত্র নয়—সেটি ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের একনায়কত্ব’।
​গণতন্ত্রের দর্শনে একটি মূলনীতি হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন তখনই বৈধ, যখন সংখ্যালঘুর অস্তিত্বের অধিকার স্বীকৃত। বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা এবং সাংবিধানিক সুরক্ষার মূল কাজটি এখানেই—ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করা।
ভোটের পরে নাগরিকত্ব
​নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচনের মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে একটি বড় ফারাক আছে। নির্বাচনের দিন নাগরিক একজন ‘রাজনৈতিক ভোক্তা’। কিন্তু নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে তার ভূমিকা যদি শুধু কর দেওয়া এবং নির্দেশ মেনে চলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেই ব্যবস্থা প্রকৃতপক্ষে ‘অংশগ্রহণমূলক’ নয়।
​রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গুইলেরমো ও’ডোনেল গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করেন—উল্লম্ব জবাবদিহিতা (জনগণের দ্বারা সরকারকে জবাবদিহি করা) এবং অনুভূমিক জবাবদিহিতা (রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পরস্পরের উপর নজরদারি)। পরবর্তীতে গবেষকরা এই দুইয়ের মাঝখানে তৃতীয় একটি মাত্রা যুক্ত করেছেন—’তির্যক জবাবদিহিতা’, যা গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের মাধ্যমে কার্যকর হয়। এই তিনটি মাত্রা একসঙ্গে কাজ না করলে জবাবদিহিতা অকার্যকর হয়ে পড়ে।
বিরোধী মত ও স্থানীয় শাসন
​গণতন্ত্রে বিরোধী মত শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; এটি ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ। যে সমাজে বিরোধী মত প্রকাশ করতে গিয়ে মানুষকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়, সেখানে ভোটের সংখ্যা যতই বেশি হোক, গণতন্ত্র শুধুই খোলস।
​জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি গণতন্ত্রের প্রথম পাঠ নেওয়া হয় স্থানীয় পর্যায়ে। আলেক্সিস দে তকভিল আমেরিকার গণতন্ত্র নিয়ে লেখার সময় পৌরসভা ও তৃণমূলের গুরুত্ব দেখিয়েছিলেন। ক্যাথলিক সামাজিক শিক্ষা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনি নীতিতে যে ‘সাবসিডিয়ারিটি’ (Subsidiarity) নীতির কথা বলা হয়—অর্থাৎ সিদ্ধান্ত যত নিকটতম পর্যায়ে নেওয়া যায়, তত ভালো—তা ডাল-এর স্থানীয় শাসনের যুক্তির সঙ্গেই মিলে যায়। বাংলাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ আইন ২০০৯-এর মাধ্যমে স্থানীয় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলেও, অভিজাততন্ত্র ও ক্ষমতার কেন্দ্রায়ন প্রায়শই তৃণমূলের কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেয়।
বৈষম্য, শিক্ষা ও জনমতের পরিসর
​স্থানীয় শাসন যদি গণতন্ত্রের প্রাথমিক পাঠশালা হয়, তবে সেই পাঠ সম্পূর্ণ হয় না যতক্ষণ না সমাজের সকল স্তরের মানুষ—বিশেষত দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারে।
​অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, “কোনো কার্যকর বহুদলীয় গণতন্ত্রে কখনো দুর্ভিক্ষ ঘটেনি।” তবে গণতন্ত্র তখনই অর্থবহ হয়, যখন দরিদ্রের কণ্ঠও সমান গুরুত্ব পায়; নতুবা তা ধনীদের খেলায় পরিণত হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৯৮৭ সালের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পরেও দীর্ঘ সময় ধরে দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার সংকট বজায় ছিল। এটি প্রমাণ করে—নির্বাচন গণতন্ত্রের সমাপ্তি নয়, বরং একটি দীর্ঘ লড়াইয়ের সূচনা মাত্র।
​জন ডিউই তাঁর Democracy and Education (ডেমোক্রেসি এন্ড ইলেকশন) -এ দেখান যে, গণতন্ত্র কেবল শাসনের কৌশল নয়, বরং পারস্পরিক অভিজ্ঞতার আদান-প্রদানের মাধ্যমে সমাজ গঠনের একটি নৈতিক আদর্শ; শিক্ষা নিজেই একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। অন্যদিকে, ইয়ুর্গেন হেবারমাসের ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ বা জনপরিসরের ধারণাটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—যেখানে ব্যক্তিরা যুক্তিনির্ভর সংলাপের (rational-critical debate) মাধ্যমে জনমত গঠন করে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। এই পরিসর শুকিয়ে গেলে ব্যালট বাক্সও নিঃসার হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
​বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এই আলোচনার একটি বাস্তব উদাহরণ। ফ্রিডম হাউসের রিপোর্টে বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৪৫—’আংশিক মুক্ত’। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (RSF)-এর World Press Freedom Index  (ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রীডম এক্সপ্রেস)-এ সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় বাংলাদেশ ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম—যা এখনও উদ্বেগজনক। অন্যদিকে, বাংলাদেশের সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন থাকলেও, সরাসরি নির্বাচিত নারীর প্রতিনিধিত্ব ঐতিহাসিকভাবে ১০ শতাংশের বেশি কখনোই হয়নি। এই চিত্রগুলো প্রমাণ করে—নির্বাচনের আয়োজন এবং নাগরিক স্বাধীনতা বা অংশগ্রহণ এক জিনিস নয়।
শেষ কথা: ভোটের বাইরে
​ডাল-এর আট শর্ত, শেডলারের কর্তৃত্ববাদ, জাকারিয়ার অন্যায় গণতন্ত্র, ও’ডোনেলের জবাবদিহিতা, তকভিলের স্থানীয় শাসন, সেনের বৈষম্য, ডিউই-র শিক্ষা ও হেবারমাসের জনপরিসর—সবগুলো আসলে একই সত্যের ভিন্ন মুখ: গণতন্ত্র ক্ষমতার একটি সীমাবদ্ধ কাঠামো, কেবল একটি নির্বাচনী অনুষ্ঠান নয়। এটি কোনো বৃত্ত নয়, একটি সর্পিল যাত্রার নাম।
​গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা নির্বাচনের দিনে নয়—তার পরের দিনগুলোতে। যে ব্যক্তি হেরে গেল, তার কণ্ঠ কতটা স্বাধীন? যে সরকার ক্ষমতায় এল, সে নিজের সীমা মেনে চলছে কি?
​গণতন্ত্র তখনই অর্থবহ হয়, যখন ক্ষমতায় যাওয়া ব্যক্তির চেয়ে ক্ষমতার সীমাটি বেশি গুরুত্ব পায়। ভোট দেওয়ার অধিকার পাওয়া এবং গণতান্ত্রিক নাগরিক হয়ে ওঠা—এই দুটির মধ্যে যে দূরত্ব, সেটি পূরণ না হলে ব্যালট বাক্সের সংখ্যা যতই বাড়ুক, গণতন্ত্রের ফাঁকা জায়গাটি ততই স্পষ্ট হবে।
​প্রশ্নটি রয়ে গেল: আমরা কি ভোটার হতে চাই, নাকি নাগরিক?

শেয়ার করুন-
এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2021 purbobangla