1. editor@purbobabgla.net : Web Editor : Web Editor
  2. admin@purbobangla.net : purbabangla :
  3. jashad1989@gmail.com : Web Editor : Web Editor
ভেজালের উৎস বন্ধ হবে কবে? উৎপাদন আমদানি সরবরাহে চাই জবাবদিহি  - পূর্ব বাংলা
বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:১৪ অপরাহ্ন

ভেজালের উৎস বন্ধ হবে কবে? উৎপাদন আমদানি সরবরাহে চাই জবাবদিহি 

পূর্ব বাংলা ডেস্ক
  • প্রকাশিত সময়ঃ বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৫ বার পড়া হয়েছে

 লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় বড় সেতু, সড়ক, ভবন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়নের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো; সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদে, স্বস্তিতে ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারছেন।
একজন মা যখন সন্তানের জন্য খাবার কিনছেন, একজন বাবা যখন পরিবারের জন্য বাজার করছেন, একজন শ্রমজীবী মানুষ যখন মাসের আয় দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার হিসাব করছেন, কিংবা একজন অসুস্থ মানুষ যখন সুস্থতার আশায় প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনছেন; সেখানেই রাষ্ট্রের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের প্রকৃত প্রতিফলন দেখা যায়। বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে দ্রব্যমূল্য, খাদ্যের মান, ভেজাল ও নকল পণ্য, শিশুখাদ্যের নিরাপত্তা, জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মান ও প্রাপ্যতা, বোতলজাত পানির মূল্য, গ্যাস ও জ্বালানি ব্যয়সহ নানা বিষয়ে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে। এসব বিষয়কে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর ভোক্তা-নিরাপত্তা, বাজার-শৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য ও জবাবদিহির প্রশ্ন হিসেবে দেখা প্রয়োজন। কারণ একজন নাগরিকের নিরাপদ খাদ্য, মানসম্মত ওষুধ এবং ন্যায্য মূল্যে প্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়ার অধিকার শুধু বাজারের বিষয় নয়; এটি একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
দ্রব্যমূল্য: বাজারে ভোক্তার অবস্থান কোথায়?
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, মাংস, সবজি, শিশুখাদ্যসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।অবশ্যই প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অসাধু ব্যবসা রয়েছে, এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার, উৎপাদন খরচ, পরিবহন, জ্বালানি, সরবরাহ ও চাহিদা; সবকিছুরই প্রভাব থাকতে পারে। কিন্তু যেখানে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি, অতিরিক্ত মুনাফা বা বাজার কারসাজির অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া যায়, সেখানে কার্যকর তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা প্রয়োজন। ভোক্তার স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজন এমন একটি বাজারব্যবস্থা, যেখানে মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া যতটা সম্ভব স্বচ্ছ এবং ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা ন্যায্য থাকে।
আধা লিটার বোতলজাত পানির দাম ২০ টাকা!
আধা লিটার বোতলজাত পানির দাম ২০ টাকা হওয়া নিয়ে অনেক ভোক্তার প্রশ্ন থাকতে পারে। কারও কাছে এটি স্বাভাবিক মনে হতে পারে, আবার কারও কাছে তুলনামূলকভাবে বেশি মনে হতে পারে। এখানে আবেগের পরিবর্তে কয়েকটি বাস্তব প্রশ্ন করা প্রয়োজন। উৎপাদন ব্যয় কত? বোতল ও প্যাকেজিংয়ের ব্যয় কত? পরিবহন ব্যয় কত? ডিলার ও পরিবেশকের কমিশন কত? খুচরা বিক্রেতার অনুমোদিত মার্জিন কত? পণ্যের গায়ে মুদ্রিত মূল্য ও বাস্তবে বিক্রয়মূল্যের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি আছে কি না? অর্থাৎ, প্রশ্নটি শুধু ‘২০ টাকা বেশি কি না’, এতটুকু নয়; বরং ভোক্তা যে মূল্য পরিশোধ করছেন, সেটি কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে এবং তা আইন ও বাজারনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও চাই সর্বোচ্চ সতর্কতা:
খাদ্যপণ্যের মতো জীবনরক্ষাকারী ওষুধের নিরাপত্তার বিষয়টিও সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। কোনো ওষুধ নকল, অননুমোদিত, নিম্নমানের বা যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা হলে তার প্রভাব শুধু ভোক্তার আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। তাই ওষুধের উৎপাদন, মান পরীক্ষা, আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বিক্রয়; প্রতিটি পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে শুধু ফার্মেসি বা খুচরা বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থেমে না গিয়ে, পণ্যটির উৎস, উৎপাদক বা আমদানিকারক, পরিবেশক ও সরবরাহব্যবস্থার সংশ্লিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত আইনসম্মত তদন্ত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে মান-পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ বা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কোনো ওষুধ বাজারে পাওয়া গেলে দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় সতর্কতা এবং বাজার থেকে প্রত্যাহারের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা উচিত। কারণ খাদ্যে ভেজাল মানুষের স্বাস্থ্য নষ্ট করতে পারে, কিন্তু জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ক্ষেত্রে একটি ত্রুটিপূর্ণ পণ্য কখনো কখনো মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শিশুখাদ্য ও মানহীন স্ন্যাকস; সতর্কতার সবচেয়ে বড় জায়গা:
খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি নতুন নয়। কিন্তু শিশুদের খাদ্য ও জনপ্রিয় স্ন্যাকসজাত পণ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। শিশুরা পণ্যের মান যাচাই করতে পারে না। আকর্ষণীয় প্যাকেট, রঙিন বিজ্ঞাপন কিংবা স্বাদের কারণে তারা কোনো একটি পণ্য পছন্দ করতে পারে। কিন্তু সেই পণ্যে কী উপাদান রয়েছে, তার পুষ্টিমান কতটা, কোনো ক্ষতিকর উপাদান নির্ধারিত সীমার বাইরে আছে কি না; এসব যাচাই করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই শিশুখাদ্য ও শিশুদের বহুল ব্যবহৃত খাদ্যপণ্যে নিয়মিত মান পরীক্ষা, সঠিক লেবেলিং, উপাদান ও পুষ্টিমান উল্লেখ এবং কার্যকর বাজার নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপদ কর্তৃপক্ষের কাঠামোর মধ্যেই খাদ্যের উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, বিতরণ ও বিক্রয় পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে খাদ্যমান, দূষণকারী উপাদান, খাদ্য সংযোজনী, প্যাকেজিং, লেবেলিং এবং পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়েও বৈজ্ঞানিক কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, আমাদের সামনে আইন ও প্রতিষ্ঠান আছে; এখন প্রয়োজন তার সমন্বিত ও কার্যকর প্রয়োগ।
দোকানে ভেজাল পাওয়া গেলে প্রশ্নটি দোকানেই থেমে থাকবে কেন?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আসে! ধরা যাক, একটি দোকানে একটি মানহীন বা নকল খাদ্যপণ্য পাওয়া গেল। আইন অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণিত হলে দোকানদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই সম্ভব এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু তদন্তের পরিধি কি সেখানেই শেষ হওয়া উচিত?
আমার প্রশ্ন- পণ্যটি দোকানে এল কীভাবে? কে উৎপাদন করেছে?
কে প্যাকেটজাত করেছে? কে সরবরাহ করেছে? কোন ডিলার বা পরিবেশক পণ্যটি বাজারে দিয়েছে? কোথায় গুদামজাত হয়েছে? যদি আমদানিকৃত হয়, তাহলে আমদানিকারক কে? পণ্যটি বৈধ পথে দেশে প্রবেশ করেছে কি না? অবৈধ পথে প্রবেশ করলে সেই পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কোথায় ব্যর্থ হয়েছে? এই প্রশ্নগুলো করা মানে কোনো নির্দিষ্ট সংস্থা বা ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা নয়। বরং এটি দায় নির্ধারণের স্বাভাবিক ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ার অংশ। কারণ একটি নকল পণ্য সাধারণত খুচরা দোকানে গিয়ে তৈরি হয় না। তার উৎপাদন, আমদানি, সরবরাহ ও বিতরণের একটি পূর্ববর্তী শৃঙ্খল থাকে। সুতরাং বাজারে নকল বা অনিরাপদ পণ্য পাওয়া গেলে তদন্তের লক্ষ্য হওয়া উচিত পুরো সরবরাহশৃঙ্খল।
দোকানদারও দায়মুক্ত নন, তবে দায়ের স্তর আলাদা হতে পারে।এখানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি। দোকানদার যদি জেনেশুনে নকল, ভেজাল বা অনিরাপদ পণ্য বিক্রি করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো দোকানদার যদি বৈধ সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্য সংগ্রহ করে থাকেন এবং পরে পরীক্ষায় সেটি মানহীন প্রমাণিত হয়, তাহলে তাঁর দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনি কী জানতেন, কীভাবে পণ্য সংগ্রহ করেছিলেন এবং তাঁর আইনগত দায়িত্ব কী ছিল; এসব বিষয় তদন্তে বিবেচিত হওয়া উচিত। অর্থাৎ, একই ঘটনায় শুধু সবচেয়ে দৃশ্যমান ব্যক্তিকে দায়ী না করে প্রকৃত দায়ের স্তর নির্ধারণ করা প্রয়োজন। দায় যার, জবাবদিহি তার; এই নীতিই হওয়া উচিত বাজার নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি।
অবৈধ আমদানির পথ বন্ধ না করলে বাজারে নকল পণ্য আসবে কীভাবে?
দেশের বাজারে কোনো অবৈধ বা নকল বিদেশি পণ্য পাওয়া গেলে খুচরা পর্যায়ের পাশাপাশি আমদানি ও সরবরাহ পর্যায়ও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন। সীমান্ত, বন্দর, কাস্টমস, স্থলবন্দর, গুদাম, পরিবহন ও পাইকারি বাজার; প্রতিটি পর্যায়ে নিজ নিজ আইনগত দায়িত্ব অনুযায়ী নজরদারি থাকা জরুরি। বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপদ কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে খাদ্য আমদানি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল করার জন্য National Food Import Information Management System পরিচালনা করছে, যেখানে আমদানি-সংক্রান্ত নথি, অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বিত প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও তথ্যনির্ভর করা গেলে অবৈধ বা ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের প্রবেশ প্রতিরোধে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিজ্ঞানভিত্তিক বাজার নিয়ন্ত্রণ জরুরি:
খাদ্যের মান নির্ধারণ শুধু প্রশাসনিক অভিযানের বিষয় নয়। এটি বিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যের বিষয়।একটি খাবারে কী পরিমাণ ক্ষতিকর রাসায়নিক রয়েছে, কোনো জীবাণু রয়েছে কি না, ভারী ধাতু বা টক্সিনের মাত্রা কত, পুষ্টিমান সঠিক কি না; এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়োজন দক্ষ পরীক্ষাগার ও বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপদ কর্তৃপক্ষের ল্যাবরেটরি রিপোজিটরিতে বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের খাদ্য পরীক্ষার সক্ষমতার তথ্য রয়েছে; এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ এবং BCSIR চট্টগ্রাম ল্যাবরেটরিও রয়েছে। বিভিন্ন পরীক্ষায় জীবাণু, রাসায়নিক দূষণ, ভারী ধাতু, মেলামাইনসহ নানা বিষয় পরীক্ষা করার সক্ষমতার তথ্যও সেখানে দেওয়া হয়েছে। তাই প্রয়োজন হলে অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা আরও জোরদার করা যেতে পারে।
চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ, বিজ্ঞানী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী; সমন্বিত উদ্যোগ চাই :
খাদ্যনিরাপত্তার মতো জটিল বিষয়ে একক কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সব কাজ করা কঠিন। এখানে প্রয়োজন বহুপক্ষীয় সমন্বয়। পুষ্টিবিদ জানাবেন; কোন খাদ্যের পুষ্টিমান ও উপাদান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। চিকিৎসক জানাবেন; কোন উপাদানের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি কী। বিজ্ঞানী ও পরীক্ষাগার জানাবে; নমুনায় প্রকৃতপক্ষে কী পাওয়া গেছে। মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মানের সঙ্গে তুলনা করবে। ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেখবে; ভোক্তা প্রতারিত হয়েছেন কি না। আমদানি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও কাস্টমস দেখবে; পণ্য বৈধ পথে এসেছে কি না। প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধের তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে সহযোগিতা করবে।এই সমন্বিত ব্যবস্থাই পারে বাজার নিয়ন্ত্রণকে আরও কার্যকর করতে।
শুধু জরিমানা নয়; প্রয়োজনে ‘পণ্য প্রত্যাহার’ ও উৎস শনাক্তকরণ:
কোনো একটি দোকান থেকে একটি ত্রুটিপূর্ণ পণ্য পাওয়া গেলে শুধু সেই প্যাকেট জব্দ করে জরিমানা করলেই ভোক্তা সুরক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। যদি একই ব্যাচের পণ্য বিভিন্ন দোকানে ছড়িয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ঝুঁকি অনুযায়ী পুরো ব্যাচ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন হলে বাজার থেকে প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করা। এতে একদিকে ভোক্তা নিরাপদ থাকবেন, অন্যদিকে প্রকৃত উৎসও শনাক্ত করা সহজ হবে। এ ধরনের ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে ব্যাচ নম্বর, উৎপাদনকারী, আমদানিকারক, পরিবেশক ও সরবরাহকারীর তথ্য সংরক্ষণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আমাদের প্রয়োজন ‘শিকড় থেকে বাজার’ পর্যন্ত নজরদার:
বাজার নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে দৃষ্টিভঙ্গির। শুধু দোকান নয়- কারখানা, আমদানি, কাস্টমস, গুদাম, ডিলার, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা, ভোক্তা; পুরো শৃঙ্খলকে বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো একটি স্তরে অপরাধ ধরা পড়লে তদন্ত প্রয়োজনে আগের স্তরে ফিরে যাবে এবং পরবর্তী স্তরেও পৌঁছাবে। এতে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে এবং একই সঙ্গে সৎ ব্যবসায়ীরাও অযথা হয়রানি থেকে সুরক্ষা পাবেন।
অভিযান হোক নিয়মিত, তথ্যভিত্তিক ও ঝুঁকিনির্ভর:
সব দোকানে একই ধরনের অভিযান চালানোর পরিবর্তে ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। যেসব পণ্যে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বেশি, সেসব পণ্যে বেশি নমুনা পরীক্ষা। যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ বা পরীক্ষায় অনিয়ম পাওয়া যায়, সেখানে বেশি নজরদারি। যেসব আমদানি বা সরবরাহ চ্যানেলে অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়, সেখানে লক্ষ্যভিত্তিক তদন্ত। এতে একদিকে সরকারি সম্পদের ব্যবহার কার্যকর হবে, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের অপ্রয়োজনীয় হয়রানির ঝুঁকিও কমবে।
ভোক্তার অধিকার রক্ষায় আস্থার পরিবেশ দরকার:
একজন সাধারণ মানুষ যদি মনে করেন অভিযোগ করে কোনো ফল হবে না, তাহলে তিনি অভিযোগ করবেন না। তাই ভোক্তার অভিযোগ গ্রহণ, তদন্তের অগ্রগতি এবং নিষ্পত্তির বিষয়ে স্বচ্ছতা বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদেরও মনে রাখতে হবে—ভোক্তার অধিকার রক্ষা মানেই ব্যবসার বিরোধিতা নয়। বরং একটি সুশৃঙ্খল বাজারে সৎ ব্যবসায়ীই দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হন।
শেষ কথা:
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে একজন মা নিশ্চিন্তে সন্তানের জন্য খাদ্য কিনতে পারবেন। যেখানে প্যাকেটের গায়ে লেখা তথ্য বিশ্বাসযোগ্য হবে। যেখানে ভোক্তা জানবেন; তিনি যে মূল্য দিচ্ছেন, তার যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। যেখানে নকল পণ্য তৈরি করলে উৎপাদক, অবৈধভাবে আনলে আমদানিকারক বা চোরাচালানকারী, জেনেশুনে সরবরাহ করলে পরিবেশক এবং জেনেশুনে বিক্রি করলে খুচরা বিক্রেতা; যার যে পর্যায়ে আইনগত দায়, সে সেই পর্যায়ে জবাবদিহির মুখোমুখি হবে। একই সঙ্গে এমন ব্যবস্থাও চাই না যেখানে কেবল অভিযান পরিচালনার সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু সমস্যার মূল উৎস অক্ষত থাকবে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত শাস্তি নয়, শাস্তির মাধ্যমে বাজারে শৃঙ্খলা; অভিযান নয়, অভিযানের মাধ্যমে স্থায়ী প্রতিরোধ; এবং শুধু ভেজাল পণ্য জব্দ নয়, ভেজালের উৎস শনাক্ত ও বন্ধ করা। দ্রব্যমূল্য, খাদ্যনিরাপত্তা, গ্যাস-জ্বালানি, প্রতিটি সমস্যার ধরন আলাদা। কিন্তু সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিষয়- জবাবদিহিতা।
জবাবদিহি:
যেখানে আইন সবার জন্য সমান, যেখানে উৎপাদক থেকে বিক্রেতা পর্যন্ত দায় নির্ধারণ করা হয়, যেখানে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং যেখানে নাগরিক আইনের ওপর আস্থা রাখতে পারেন; সেখানেই একটি নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গড়ে উঠতে পারে। তাই এখন সময় এসেছে শুধু প্রশ্ন করার নয়, সঠিক জায়গায় প্রশ্ন করার।
দোকানে কেন ভেজাল? তার আগে প্রশ্ন হোক; ভেজাল পণ্যটি তৈরি হলো কোথায়? বাজারে নকল পণ্য কেন? তার আগে প্রশ্ন হোক; নকল পণ্যটি বাজারে প্রবেশ করল কীভাবে? দাম কেন বেশি? তার আগে প্রশ্ন হোক; মূল্য নির্ধারণ ও সরবরাহব্যবস্থার কোথায় অসঙ্গতি রয়েছে? নিম্নমানের বা অননুমোদিত ওষুধ বাজারে এলো কীভাবে? তার আগে প্রশ্ন হোক; উৎপাদন, আমদানি, সংরক্ষণ ও সরবরাহের কোন পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা এবং প্রকৃত দায় নির্ধারণ করাই হতে পারে একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব রাষ্ট্র গঠনের পথে আমাদের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ শুধু ভেজাল পণ্য জব্দ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; ভেজালের উৎস বন্ধ করতে হবে। শুধু নকল পণ্য বিক্রেতাকে শনাক্ত করলেই হবে না; নকল পণ্য বাজারে প্রবেশের পথও বন্ধ করতে হবে। আর শুধু মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ করলেই হবে না; মূল্য নির্ধারণ ও সরবরাহব্যবস্থার প্রকৃত কারণও খুঁজে বের করতে হবে। দায় যার, জবাবদিহি তার; এই নীতিই হোক একটি সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ বাজারব্যবস্থার ভিত্তি।
শেয়ার করুন-
এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2021 purbobangla