
সাঈদুর রহমান লিটন
বিরাট একটা মাঠ। মাঠজুড়ে পাট আর ধানের সবুজ গালিচা বিছানো। হালকা বাতাস বয়ে গেলে পাটগাছগুলো দুলে ওঠে। তখন মনে হয়, সবুজের সমুদ্রের ওপর ঢেউ খেলছে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ভরে থাকে চারপাশ।
এই মাঠের ঠিক মাঝখানে একটি পুরোনো ভিটে। স্থানীয় লোকজন একে ‘ভর ভিটে’ নামে চেনে। ভিটাটিতে সারি সারি খেজুরগাছ দাঁড়িয়ে আছে। গাছগুলো বহু বছরের পুরোনো। নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না, রসও সংগ্রহ করা হয় না। তাই জায়গাটি কিছুটা নির্জন ও রহস্যময় মনে হয়। কিন্তু এই নির্জনতাই যেন প্রকৃতিকে দিয়েছে এক অনন্য সৌন্দর্য।
ভিটার প্রায় প্রতিটি খেজুরগাছেই বাবুই পাখির বাসা ঝুলে থাকে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, গাছে অসংখ্য শিল্পকর্ম ঝুলছে। বাবুই পাখি নিজের ঠোঁট আর অসাধারণ দক্ষতা দিয়ে খেজুরপাতার আঁশ ছিঁড়ে সূক্ষ্ম তন্তু তৈরি করে। সেই তন্তু গেঁথে গেঁথে তৈরি করে দৃষ্টিনন্দন বাসা। এ কারণেই বাবুইকে ‘কারিগর পাখি’ বলা হয়।
বাবুই পাখির বাসা শুধু সুন্দরই নয়, অত্যন্ত পরিকল্পিতও। বাসার ভেতরে থাকে একাধিক কক্ষের মতো অংশ। প্রবেশের জন্য থাকে সরু একটি পথ, যা এমনভাবে তৈরি করা হয় যে বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায় না। ফলে সাপ, টিকটিকি কিংবা অন্য কোনো শিকারি প্রাণী সহজে বাসার ভেতরে ঢুকতে পারে না। এভাবেই বাবুই তার ডিম ও ছানাদের নিরাপদে লালন-পালন করে। ছোট্ট একটি পাখির এমন বুদ্ধিমত্তা সত্যিই বিস্ময়কর।
বাতাস বইলে সারি সারি বাসা একসঙ্গে দুলতে থাকে। সেই দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে দেয়। আর বাবুই পাখির কিচিরমিচির ডাক চারপাশের নীরবতা ভেঙে পুরো মাঠকে প্রাণবন্ত করে তোলে। প্রকৃতিপ্রেমীরা এখানে এলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে এই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।
বাবুই পাখি আমাদের শেখায় পরিশ্রম, ধৈর্য ও নিখুঁত পরিকল্পনার মূল্য। ক্ষুদ্র একটি পাখি নিজের শ্রম আর মেধা দিয়ে এমন বাসা তৈরি করতে পারে, যা বড় বড় স্থপতিকেও বিস্মিত করে। তাই আমাদেরও প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হবে, পাখিদের আবাসস্থল রক্ষা করতে হবে এবং গাছ কাটা থেকে বিরত থাকতে হবে। কারণ গাছ বাঁচলে পাখি বাঁচবে, আর পাখি বাঁচলে প্রকৃতির সৌন্দর্যও অটুট থাকবে।
মধ্য মাঠের সেই ভর ভিটা আজও বাবুই পাখির বাসার জন্য এক অনন্য আকর্ষণ। যে একবার এই দৃশ্য দেখবে, তার মনে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা জন্ম নেবে এবং বারবার সেখানে ফিরে যেতে ইচ্ছে করবে।