1. editor@purbobabgla.net : Web Editor : Web Editor
  2. admin@purbobangla.net : purbabangla :
  3. jashad1989@gmail.com : Web Editor : Web Editor
রেলস্টেশনই ছিল যার ঠিকানা - পূর্ব বাংলা
শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৪ অপরাহ্ন

রেলস্টেশনই ছিল যার ঠিকানা

পূর্ব বাংলা ডেস্ক
  • প্রকাশিত সময়ঃ শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

সাঈদুর রহমান লিটন

 

ভোরের প্রথম ট্রেনটা যখন হুইসেল বাজিয়ে প্ল্যাটফর্ম ছুঁয়ে যায়, তখনও শহরের অর্ধেক মানুষ ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু একজন মানুষ অনেক আগেই জেগে ওঠেন। হাতে বাঁশের ঝাঁটা, পাশে একটা পুরোনো বালতি, চোখে ক্লান্তি আর মুখে কোনো শব্দ নেই। শব্দহীন মানুষটির নাম ছিল মর্জিনা বেগম।

তিনি বোবা ছিলেন। তাই কারও সঙ্গে তর্ক করতেন না, অভিযোগও করতেন না। শুধু ভাঙা ভাঙা হাসি দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন, তিনি আছেন, কাজ করছেন, বেঁচে আছেন।

স্টেশনটাই যেন ছিল তাঁর সংসার। প্ল্যাটফর্মে পড়ে থাকা চায়ের কাপ, বিস্কুটের মোড়ক, কাদামাখা বাথরুম, সবকিছুর সঙ্গে তাঁর এক অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল। যেন এই নোংরাগুলো পরিষ্কার করলেই পৃথিবীটা একটু সুন্দর হবে।

লোকজন তাঁকে চিনত। কেউ কেউ পুরোনো কাপড় দিত, কেউ দুপুরের ভাত। আবার অনেকে পাশ কাটিয়ে চলে যেত, যেন তিনি কোনো মানুষ নন, সামান্য কোন অস্তিত্ব মাত্র।

কেউ জানত না, মর্জিনা বেগমেরও একটা পরিবার ছিল।

অনেক বছর আগে অভাব, ভুল বোঝাবুঝি আর ভাগ্যের নির্মম আঘাতে তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। প্রথম দিকে হয়তো অপেক্ষা করেছিলেন, কেউ এসে বলবে, চলো, বাড়ি ফিরি। তারপর একদিন সেই অপেক্ষাও শেষ হয়ে যায়। মানুষ যখন দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে, তখন অপেক্ষাটাও একসময় মরে যায়।

তবু তিনি বাঁচতেন।

একটা ছোট্ট টিনের বাক্সে প্রতিদিন কয়েকটা করে টাকা জমাতেন। পাঁচ টাকা, দশ টাকা, কখনো পঞ্চাশ টাকা । বছরের পর বছর ধরে জমিয়ে হয়েছিল  চল্লিশ হাজার টাকা।

কেউ জিজ্ঞেস করলে ইশারায় বুঝিয়ে দিতেন, একটা ছোট ঘর করবেন। বর্ষার রাতে যাতে ছাদ দিয়ে পানি না পড়ে। আর একটা খাট কিনবেন, যেখানে শুয়ে এক রাত নিশ্চিন্তে ঘুমানো যায়।

স্বপ্নগুলো খুব বড় ছিল না।

কিন্তু পৃথিবী সব সময় বড় স্বপ্নই ভাঙে না,  কখনো কখনো সবচেয়ে ছোট স্বপ্নটাও নির্মমভাবে চূর্ণ করে দেয়।

সেদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টি পড়ছিল।

মর্জিনা বেগম তাঁর টিনের বাক্সটা নিয়ে ফিরছিলেন বস্তির দিকে। অন্ধকার গলিতে কয়েকজন দুর্বৃত্ত তাঁর পথ আটকে দাঁড়াল।

তারা টাকা চাইলো।

মর্জিনা বেগম কথা বলতে পারতেন না। দুই হাতে বাক্সটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন। চোখে ভয় ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল বহু বছরের কষ্টে জমানো স্বপ্ন হারানোর আতঙ্ক।

পরক্ষণেই শুরু হলো নির্মম মারধর।

বৃষ্টি তখন আরও জোরে নামছিল।

রাস্তার ওপর পড়ে থাকা মানুষটার রক্ত আর বৃষ্টির পানি একসঙ্গে মিশে যাচ্ছিল। দুর্বৃত্তরা টিনের বাক্সটা নিয়ে চলে গেল।

ভেতরে ছিল চল্লিশ হাজার টাকা।

আর বাক্সটার সঙ্গে তারা নিয়ে গেল এক বোবা মানুষের পঁচিশ বছরের আশা।

হাসপাতালে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সব শেষ।

ময়নাতদন্তের পর হাসপাতালের লোকজন অপেক্ষা করল, হয়তো পরিবারের কেউ আসবে।

কেউ এল না।

যাদের সঙ্গে তাঁর রক্তের সম্পর্ক ছিল, তাদের কাছে তিনি অনেক আগেই হারিয়ে গিয়েছিলেন।

অবশেষে কয়েকজন অপরিচিত মানুষ তাঁকে কবর দিল।

জানাজায় ভিড় ছিল না।

কবরের পাশে কান্নার মানুষও ছিল না।

শুধু আকাশ কাঁদছিল।

বৃষ্টির ফোঁটাগুলো একটার পর একটা মাটির ওপর পড়ছিল। মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি নিজেই যেন সেই মানুষটার জন্য দোয়া করছে, যিনি সারাজীবন মানুষের ফেলে যাওয়া নোংরা পরিষ্কার করেছেন, অথচ মানুষের মন থেকে নিজের জন্য একটুখানি জায়গাও পরিষ্কার করতে পারেননি।

কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ রেলকর্মী আস্তে করে একটা কদম গাছের চারা মাটিতে পুঁতে দিলেন।

কেউ তাঁকে বলেনি।

কেউ দেখেওনি।

তিনি শুধু বললেন, গাছটা বড় হলে অন্তত ছায়া দেবে। মানুষটার জীবনে তো ছায়া ছিল না।

বছর কেটে যাবে।

স্টেশনে নতুন ঝাড়ুদার আসবে। নতুন ট্রেন আসবে। নতুন যাত্রীদের ভিড় হবে।

কদম গাছটা হয়তো একদিন বড় হবে।

তার ফুল ঝরে পড়বে সেই কবরের ওপর।

হয়তো কেউ জানবেও না, নিচে ঘুমিয়ে আছেন এমন একজন মানুষ, যিনি সারাজীবন অন্যের পথ পরিষ্কার করেছেন, কিন্তু নিজের জীবনের পথটা কোনোদিন আলোয় ভরাতে পারেননি।

মানুষের মৃত্যু একদিন হয়।

কিন্তু সমাজের সবচেয়ে বড় মৃত্যু ঘটে সেদিন, যেদিন একজন অসহায় মানুষের জীবন, স্বপ্ন আর মৃত্যুকে আমরা এতটাই সাধারণ মনে করি যে, তাকে মনে রাখার প্রয়োজনও অনুভব করি না।

শেয়ার করুন-
এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2021 purbobangla