1. editor@purbobabgla.net : Web Editor : Web Editor
  2. admin@purbobangla.net : purbabangla :
  3. jashad1989@gmail.com : Web Editor : Web Editor
আমার দেখা সিন্দুরমতি দীঘি - পূর্ব বাংলা
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০১:১৪ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
আমার দেখা সিন্দুরমতি দীঘি আজ বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক নুরুল আবছার চৌধুরীর ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী হাসিনা-বেনজীরসহ ৮ জনের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাঁশখালীতে এনজিও ব্যুরো প্রধান ড. জাকারিয়া চট্টগ্রামে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত পুনর্বাসনে কাজ করা হচ্ছে মৌলানা হাবীব উল্লাহ (রহ.) ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বন্যাদুর্গত পরিবারের মাঝে ঢেউটিন বিতরণ বাণীগ্রামে লোকনাথ ব্রহ্মচারীর ২৯৬তম আবির্ভাব উৎসব উদযাপন পরিষদ গঠিত  চট্টগ্রামে বাজার তদারকিতে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা জরিমানা আদায়, অভিযোগ নিষ্পত্তির হার ৯৭ শতাংশ এআই সুবিধাসহ এক্স৭ডি স্মার্টফোন নিয়ে আসছে অনার,  বুকিং ৪ অক্টোবর থেকে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের ফ্ল্যাটে দুদকের অভিযান চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক হলেন মাহবুবের রহমান শামীম

আমার দেখা সিন্দুরমতি দীঘি

পূর্ব বাংলা ডেস্ক
  • প্রকাশিত সময়ঃ মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬
  • ৬ বার পড়া হয়েছে

আজহারুল আল আজাদ

প্রাচীন কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ভারত উপমহাদেশে জমিদার জোয়ারদারদের অনেক ইতিহাস ঐতিহ্য স্থাপত্য রয়েছে। কালের বিবর্তনে কোনটি ইতিহাস হয়েছে আবার কোনটি বিলীন হয়েছে। আজকে আমি সিন্দুরমতি দীঘি সম্পর্কে সংগৃহীত ইতিকথা আলোচনা করছি।

সিন্দুরমতি দীঘির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:-
বাংলার ইতিহাস শুধু রাজা-বাদশাহ, যুদ্ধ কিংবা সাম্রাজ্যের ইতিহাস নয়; এ ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে গ্রামীণ জনপদের অসংখ্য দীঘি, মন্দির, মসজিদ, জমিদারবাড়ি ও লোককথা। উত্তরবঙ্গের লালমনিরহাট অঞ্চলে অবস্থিত সিন্দুরমতি দীঘি তেমনই এক ঐতিহাসিক নিদর্শন, যা যুগ যুগ ধরে মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে। এই দীঘিকে ঘিরে যেমন লোকজ কিংবদন্তি রয়েছে, তেমনি রয়েছে জমিদার শাসনের স্মৃতি, ধর্মীয় আবেগ এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস। উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে সিন্দুরমতি দীঘি শুধু একটি জলাশয় নয়; এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়, একটি ঐতিহাসিক স্মারক এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতীক।
সিন্দুরমতি দীঘির অবস্থান বর্তমান লালমনিরহাট জেলার সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের সিন্দুরমতি এলাকায়। এটি কুড়িগ্রাম জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় বহুদিন ধরে দুই জেলার মানুষের সাংস্কৃতিক মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত। বিস্তীর্ণ আয়তনের এই দীঘিটি বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় জনগণের পানির চাহিদা পূরণ করেছে। সেই সঙ্গে এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি ও জনজীবনের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলায় দীঘি খননের ঐতিহ্য অত্যন্ত প্রাচীন। প্রাচীন ও মধ্যযুগে রাজা-জমিদাররা জনকল্যাণমূলক কাজ হিসেবে বড় বড় দীঘি খনন করতেন। কারণ তখন আধুনিক পানীয় জলের ব্যবস্থা ছিল না। ফলে পানির সংকট দূর করা এবং কৃষিকাজে সহায়তার জন্য দীঘি খনন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিশ্বাস, পূণ্য অর্জন কিংবা নিজের স্মৃতিকে অমর করে রাখার উদ্দেশ্যেও দীঘি খনন করা হতো। সিন্দুরমতি দীঘিও সেই ঐতিহ্যেরই অংশ।
স্থানীয় লোকমুখে প্রচলিত আছে যে, এই দীঘি খনন করেছিলেন তৎকালীন জমিদার রাজা নীলাম্বর সেন বা তাঁর বংশধরেরা। যদিও এ বিষয়ে লিখিত প্রমাণ খুব কম পাওয়া যায়, তবু স্থানীয় প্রবীণদের মুখে মুখে এ কাহিনি এখনো প্রচলিত। কেউ কেউ মনে করেন, জমিদার নীলাম্বর সেন ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ও জনদরদি ব্যক্তি। তিনি প্রজাদের পানির কষ্ট দূর করার জন্য এই বিশাল দীঘি খননের উদ্যোগ নেন। আবার আরেকটি মতে, তাঁর স্ত্রী সিন্দুরমতি দেবীর নাম অনুসারেই দীঘিটির নামকরণ করা হয় “সিন্দুরমতি দীঘি”। জনশ্রুতি আছে, সিন্দুরমতি দেবী ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু ও সমাজসেবী নারী। তাঁর ইচ্ছাতেই এই দীঘি খনন করা হয়েছিল।
লোককথা অনুযায়ী, দীঘি খননের সময় নানা অলৌকিক ঘটনার সৃষ্টি হয়। বলা হয়, যতই মাটি খনন করা হতো, ততই পানির উৎস বের হয়ে আসত। স্থানীয় মানুষ এটিকে দেবীর আশীর্বাদ হিসেবে দেখতেন। অনেকে বিশ্বাস করতেন, এই দীঘির পানিতে অলৌকিক শক্তি রয়েছে। ফলে দীঘিটি দ্রুতই ধর্মীয় গুরুত্ব লাভ করে।
সিন্দুরমতি দীঘিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, তা হলো সিন্দুরমতি মেলা। প্রতি বছর চৈত্র মাসে রামনবমী উপলক্ষে এখানে বিশাল মেলা বসে। বহু শতাব্দী ধরে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এই সময় দীঘিতে পুণ্যস্নান করেন। তাঁদের বিশ্বাস, এই পানিতে স্নান করলে পাপ মোচন হয় এবং জীবনে শান্তি আসে। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসাম থেকেও বহু ভক্ত এখানে আসেন।
মেলার সময় পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। গ্রামীণ হস্তশিল্প, মাটির খেলনা, লোকজ বাদ্যযন্ত্র, মিষ্টান্ন ও বিভিন্ন পণ্যের দোকান বসে। আগে এই মেলা ছিল উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ গ্রামীণ বাণিজ্যকেন্দ্র। দূরদূরান্তের ব্যবসায়ীরা এখানে ব্যবসা করতে আসতেন। ফলে সিন্দুরমতি দীঘি শুধু ধর্মীয় কেন্দ্র নয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে ওঠে।
ঔপনিবেশিক আমলেও সিন্দুরমতি দীঘির গুরুত্ব ছিল ব্যাপক। ব্রিটিশ শাসনামলে জমিদারি প্রথা চালু থাকলেও গ্রামীণ সমাজে দীঘিগুলোর সামাজিক গুরুত্ব কমেনি। বরং বহু জমিদার নিজেদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য দীঘির রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। সিন্দুরমতি দীঘিও সেই সময় স্থানীয় জমিদার পরিবারের তত্ত্বাবধানে ছিল। জমিদাররা দীঘির পাড় সংস্কার, ঘাট নির্মাণ এবং মন্দির স্থাপনের কাজ করতেন।
দীঘির চারপাশে কয়েকটি প্রাচীন মন্দির গড়ে ওঠে। এসব মন্দিরে কালী, শিব ও বিষ্ণুর পূজা অনুষ্ঠিত হতো। ফলে এটি ধীরে ধীরে একটি তীর্থস্থানে পরিণত হয়। স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এই এলাকা অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত হতে থাকে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও সিন্দুরমতি দীঘির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অটুট থাকে। ১৯৭৫ সালে সরকারি উদ্যোগে দীঘিটির সংস্কারকাজ শুরু হয়। সেই সময় খননের সময় বেশ কিছু প্রাচীন মুদ্রা, ধাতব অলংকার ও মূর্তি উদ্ধার করা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এসব নিদর্শন থেকে বোঝা যায় যে, এ অঞ্চলে বহু আগে থেকেই সমৃদ্ধ জনবসতি ছিল। উদ্ধারকৃত কিছু মূর্তি পাল ও সেন যুগের শিল্পরীতির সঙ্গে মিল পাওয়া যায় বলে ধারণা করা হয়।
জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত এসব নিদর্শন গবেষকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। তাঁরা মনে করেন, সিন্দুরমতি দীঘি কেবল একটি ধর্মীয় স্থান নয়; এটি উত্তরবঙ্গের প্রাচীন সভ্যতা ও সামাজিক জীবনেরও সাক্ষ্য বহন করে।
লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রেও সিন্দুরমতি দীঘির অবদান উল্লেখযোগ্য। এই দীঘিকে ঘিরে অসংখ্য গান, পালাগান, কীর্তন ও লোককাহিনি সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামীণ কবিয়ালরা দীঘির ইতিহাস নিয়ে গান রচনা করেছেন। বিশেষ করে রামনবমীর মেলায় এসব গান পরিবেশিত হতো।
অনেক প্রবীণ মানুষ এখনো বলেন, একসময় মেলার রাতে দীঘির পানিতে প্রদীপ ভাসানো হতো। শত শত প্রদীপের আলোয় পুরো দীঘি ঝলমল করত। সেই দৃশ্য ছিল অপূর্ব। দূরদূরান্তের মানুষ শুধু এই দৃশ্য দেখার জন্যই এখানে আসতেন।
সিন্দুরমতি দীঘি ধর্মীয় সম্প্রীতিরও প্রতীক। যদিও এটি মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত, তবু মুসলমানসহ অন্যান্য ধর্মের মানুষও মেলায় অংশ নেন। গ্রামীণ সমাজে এই মেলা মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এখানে আনন্দ ভাগাভাগি করেন।
বর্তমানে আধুনিকতার প্রভাবে গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও সিন্দুরমতি দীঘির আবেদন এখনো কমেনি। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ এখানে আসেন। তবে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে দীঘিটির ঐতিহাসিক স্থাপনা ও পরিবেশ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গবেষকরা মনে করেন, সরকারিভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়ন করা হলে এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
পর্যটনের দিক থেকেও সিন্দুরমতি দীঘির সম্ভাবনা অনেক। বিশাল জলরাশি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মেলা ও লোকসংস্কৃতি মিলিয়ে এটি একটি অনন্য স্থান। যদি যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা যায় এবং পর্যটকদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়, তাহলে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এটি আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে।
শিক্ষাবিদদের মতে, সিন্দুরমতি দীঘির ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানানো প্রয়োজন। কারণ ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। সিন্দুরমতি দীঘি আমাদের শেখায়, জনকল্যাণমূলক কাজ কীভাবে যুগের পর যুগ মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকতে পারে।
এ অঞ্চলের মানুষ এখনো বিশ্বাস করেন, দীঘিটি তাঁদের আশীর্বাদ ও ঐতিহ্যের প্রতীক। অনেক পরিবারে সন্তান জন্ম, বিবাহ কিংবা নতুন কাজ শুরু করার আগে এখানে এসে পূজা বা প্রার্থনা করার রীতি রয়েছে।
কালের বিবর্তনে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে, রাজা-বাদশাহদের শাসন শেষ হয়েছে, কিন্তু সিন্দুরমতি দীঘি আজও টিকে আছে। এটি যেন অতীতের এক জীবন্ত স্মারক, যা উত্তরবঙ্গের ইতিহাসকে আজও বহন করে চলেছে।
পরিশেষে বলা যায়, সিন্দুরমতি দীঘি শুধু একটি ঐতিহাসিক জলাশয় নয়; এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি, ধর্মীয় আবেগ ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জমিদার নীলাম্বর সেন ও সিন্দুরমতি দেবীর স্মৃতিবাহী এই দীঘি যুগ যুগ ধরে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। ইতিহাস, লোককথা ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে সিন্দুরমতি দীঘি আজও বাংলাদেশের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক নিদর্শন!
সুত্র- বাস্তব দেখা, গুগোল

শেয়ার করুন-
এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2021 purbobangla