
নজরুল ইসলাম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের পরিচয় কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ, একটি পদ-পদবি কিংবা একটি সময়ের ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। তারা সময়ের সাক্ষী, রাজপথের কর্মী, সমাজের বিবেক, ইতিহাসের অনুসন্ধানী এবং জনমানুষের কণ্ঠস্বর। তাদের জীবনকে বুঝতে হলে কেবল রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তাদের সংগ্রাম, দর্শন, লেখনী, সামাজিক আন্দোলন এবং জাতীয় জীবনে রেখে যাওয়া অবদানকে একসঙ্গে দেখতে হয়। বর্তমান গণদলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান সাংবাদিক লেখক মো. কামাল উদ্দিন সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন, যার জীবনকে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টি হলেও তার চার দশকের কর্মজীবন পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় তিনি ক্ষমতার রাজনীতির চেয়ে জনস্বার্থের রাজনীতিকে, দলীয় আনুগত্যের চেয়ে সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতাকে এবং ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
তার রাজনৈতিক
চেতনার শুরু কৈশোরেই। ১৯৭৯ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে অনুপ্রাণিত হন। পরে আশির দশকে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। বিএনপি বিভক্ত হওয়ার সময় তিনি মহাসচিব কে. এম. ওবায়দুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্রদলের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতি নয়, আদর্শ ও সংগঠনের প্রশ্নই ছিল তার কাছে মুখ্য।
নব্বইয়ের দশকের পর তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। দলীয় রাজনীতির পরিবর্তে মানুষের রাজনীতি করবেন। সেই সিদ্ধান্তই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তিনি ছাত্র সংগ্রাম কমিটির কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে শিক্ষা সংস্কার, কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা, উচ্চশিক্ষায় আসন বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস বন্ধ এবং দলীয় লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। পরে বাংলাদেশ বেকার পুনর্বাসন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে বেকার যুবকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামেও নেতৃত্ব দেন।
কিন্তু তার সবচেয়ে দীর্ঘ এবং উল্লেখযোগ্য অধ্যায় শুরু হয় চট্টগ্রামকে ঘিরে। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির একজন সংগঠক হিসেবে এবং পরবর্তীতে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব হিসেবে নাগরিক অধিকার ও উন্নয়নের প্রশ্নে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে আসছেন।
চট্টগ্রামের উন্নয়নের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বহু গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে। চট্টগ্রামে ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন, খাল-বিল-নদী রক্ষা আন্দোলন, সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স বৃদ্ধির বিরুদ্ধে নাগরিক আন্দোলন, কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়নের আন্দোলন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ বাস্তবায়নের দাবিতে দীর্ঘ আন্দোলন, চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে নাগরিক কর্মসূচি, পাহাড় কাটা বন্ধ, পরিবেশ রক্ষা, নগর পরিকল্পনা, যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন এসব ক্ষেত্রেই তিনি একজন সক্রিয় সংগঠক, বক্তা, লেখক এবং জনমত সৃষ্টিকারী হিসেবে কাজ করেছেন।
হালে চট্টগ্রামের উন্নয়নের যে বাস্তবতা আমরা দেখি, তা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অবদান নয়। এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য নাগরিক সংগঠন, সামাজিক আন্দোলন, গণদাবি এবং দীর্ঘ সংগ্রাম। সেই ইতিহাসে মো. কামাল উদ্দিনের মতো সংগঠকদের অবদানও বিবেচনার দাবি রাখে। ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নে এই ধরনের অবদান অন্তর্ভুক্ত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে তিনি সাংবাদিকতা ও গবেষণার মাধ্যমে সমাজের অসঙ্গতি, দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস, প্রশাসনিক অনিয়ম, পরিবেশ ধ্বংস এবং উন্নয়ন বৈষম্যের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে লিখে চলেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মওলানা ভাসানীসহ বাংলাদেশের জাতীয় নেতাদের নিয়ে তার গবেষণা প্রমাণ করে, ইতিহাসের প্রতি তার আগ্রহ কোনো দলীয় সীমারেখায় আবদ্ধ নয়।
বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ছিল একটি নির্দিষ্ট সময়ের সাংগঠনিক দায়িত্বকে কেন্দ্র করে। পরে সেই সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তিত হয় এবং তিনি আর সেই দায়িত্বে থাকেননি। এই বিষয়টি তিনি প্রকাশ্যেই ব্যাখ্যা করেছেন। তবুও তাকে ঘিরে নানা ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। একইভাবে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সরকারের সমালোচনামূলক লেখালেখি এবং সাম্প্রতিক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আমন্ত্রণে গণদলের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দলের সিদ্ধান্তে এবং বিশেষ আমন্ত্রণে নৈশভোজে অংশগ্রহণ নিয়ে কিছু মহলের বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, উভয় ঘটনাকেই ভিন্ন ভিন্ন পক্ষ নিজেদের রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে।
কামাল উদ্দিনের বক্তব্য পরিষ্কার—তিনি ব্যক্তি নয়, নীতিকে মূল্যায়ন করেন। রাষ্ট্র সংস্কার, সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং জনস্বার্থভিত্তিক কর্মসূচির পক্ষে তিনি অবস্থান নিতে চান। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, একজন লেখক ও সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার স্বাধীনতা; সেই স্বাধীনতাকে কোনো দলীয় পরিচয়ের কাছে সমর্পণ করা উচিত নয়।
সময়ের বিচারে মানুষকে বিচার করা যায়, কিন্তু ইতিহাসের বিচারে মানুষকে মূল্যায়ন করতে হয় তার কর্মের ভিত্তিতে। রাজপথের সংগ্রাম, কলমের লড়াই, সামাজিক আন্দোলন এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ যাত্রায় মো. কামাল উদ্দিন একটি স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছেন। সেই পরিচয়কে অস্বীকার করা যেমন সহজ নয়, তেমনি একটি মাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে তাকে আবদ্ধ করাও ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না।
কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত প্রচারণার নয়—তথ্য, অবদান এবং সময়ের নিরপেক্ষ রায়ের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে।