বিশেষ প্রতিনিধি
ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্বের গণবসতি শহর। পরিবেশ বিপর্যয় ও আবহাওয়া পরিবর্তন এই দুটো শহরে ঘিরে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও ভয় বিরাজ করছে সচেতন মহলে। তুরুষ্ক ও সিরিয়ার ভুমিকম্প বাংলাদেশের মানুষকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। দুনিয়া জুড়ে চলছে তুরুষ্ক ও সিরিয়ার ভূমিকম্প নিয়ে নানা জল্পন-কল্পনা। সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘন ঘন ভুমিকম্পে দেশবাসীকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে।পরিবেশবিদেরা বলছেন-ভূমিকম্পের বড় ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। ফলে তুরস্ক ও সিরিয়ার মতো ভূমিকম্পের কথা ভেবে ভীতু হয়ে পড়ছে জনগণ, ভূমিকম্প রোধে কিংবা মোকাবেলায় স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসছে সরকারের প্রস্তুতি কেমন, এই নিয়ে পূর্ব বাংলা পত্রিকার বিশেষ রিপোর্ট।
যেকোন সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশ ভূমিকম্প মোকাবেলায় তেমন কোন প্রস্তুতি নেই বললেই চলে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তুরস্কের মতো বড় ভূমিকম্প বাংলাদেশে হলে উদ্ধার কাজ পরিচালনা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তারা বলছেন, রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে যে পরিমাণ বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে তাতে ভূমিকম্পে এসব ভবন ধসে পড়লে শহরগুলো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। যার কারণে ব্যাহত হবে উদ্ধার কাজ।
জানা গেছে, ভূমিকম্প মোকাবেলার জন্য চীনের সহায়তায় ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। কিন্তু
কাজ চলছে ধীর গতিতে। এই সেন্টারের মাধ্যমে সরকারের পাশাপাশি
সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে দুর্যোগের আগে ও পরে নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়। এছাড়াও অন্য কোন দেশ থেকে উদ্ধার সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও দরকার হয় এই ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তুরস্কসহ অন্যান্য দেশের ভূমিকম্পের পর তাদের থেকে শিক্ষা নিয়ে অবিলম্বে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেয়া উচিত বাংলাদেশের। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, সাধারণত প্রতি একশ বছর পর পর বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে সর্বশেষ ১৮২২ এবং ১৯১৮ সালে মধুপুর ফল্টে বড় ভূমিকম্প হয়েছিল। সে হিসেবে আরেকটি বড় ভূমিকম্পের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, ভূমিকম্পের জন্য দায়ী বেশ কয়েকটি প্লেট ও সাব-প্লেটের উপর বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ার কারণে যেকোন মুহূর্তে বাংলাদেশেও ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। ভূতত্ত্ববিদরা হুঁশিয়ার করেছেন যে, এসব ভূমিকম্প সাত বা আট মাত্রা বা তারও বেশি হবে।
মাত্র ১৩ ঘণ্টার ব্যবধানে বাংলাদেশে পরপর তিনটি ভূমিকম্পে কেঁপেছে দেশ। এর ফলে দেশজুড়ে জনগণের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। স্বল্প সময়ে এমন ঘন ঘন কম্পন দেশের ভূতাত্ত্বিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। যদিও কম্পনগুলোর মাত্রা ছিল মৃদু-মাঝারি, তবুও সাধারণ মানুষ আতঙ্কে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়,২৬ নভেম্বর দিবাগত রাত ৩টার পর থেকে ২৭ নভেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে প্রায় ১৩ ঘণ্টার মধ্যে এই কম্পনগুলো অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে কম্পনগুলোর মাত্রা ছিল মাঝারি বা হালকা।
বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটের দিকে ভুমিকম্প অনুভূত হয় রাজধানীতে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াত কবির এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, এটা স্বল্পমাত্রার ভূমিকম্প। এর উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর ঘোড়াশালে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৬। রাজধানীতে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। আবহাওয়া অফিস পর্যবেক্ষণ করে মাত্রা জানাচ্ছে।এদিকে ভারতের জাতীয় ভূকম্পবিদ্যা কেন্দ্র (এনসিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৬। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার ভেতরে।
২২ ও ২৩ নভেম্বর দুইদিনের ব্যবধানে ঢাকা ও এর আশপাশ এলাকায় চারবার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এদের মধ্যে তিনটির উৎপত্তিস্থলই ছিল নরসিংদী এবং একটির ঢাকা।এর মধ্যে শুক্রবার (২১ নভেম্বর) একটি শনিবার (২২ নভেম্বর) তিনটি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়।
সরকারের প্রস্তুতি কেমন?
বাংলাদেশে তুরস্ক ও সিরিয়ার মতো বড় মাপের ভূমিকম্প হলে পরিস্থিতি যে ভয়াবহ হবে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।
২০০৯ সালে সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও জাইকার যৌথ জরিপে বলা হয়, ঢাকা কিংব চট্টগ্রামে সাত বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হলে ঢাকা শহরের ৭২ হাজার ভবন ভেঙে পড়বে এবং এক লাখ ৩৫ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে তৈরি হবে সাত কোটি টন কনক্রিটের স্তূপ।
ভূমিকম্প মোকাবেলায় তেমন কোন প্রস্তুতি না থাকার অভিযোগ উঠলেও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান বলেন, উদ্ধার কাজের জন্য সিটি কর্পোরেশনগুলোকে আলাদা আলাদা অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে এসব অঞ্চলে ৩৬ হাজার প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত রাখা হয়েছে তাদের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হয়েছে। দায়িত্ব রয়েছে সামরিক বাহিনীগুলোরও।
এছাড়া উদ্ধার কাজের সহায়তার জন্য ২০১৯ সালে ২২০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। আগামী জুনের মধ্যে আরো যন্ত্রপাতি বাংলাদেশ হাতে পাবে। অনুসন্ধান ও উদ্ধার কাজ এবং দুর্যোগ মোকাবেলা কার্যক্রম শক্তিশালী করতে ২৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে
কিন্তু ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলি আহমদ খান বলেন, ভূমিকম্প মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি খুবই অপ্রতুল।
তিনি বলেন, ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করতে হয় যার জন্য ন্যাশনাল অপারেশন সেন্টার দরকার। বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের কোন সংস্থা নেই।