
হালিশহর এলাকায় ফুটপাত দখল করে বসানো ভ্যানগাড়ি, টং দোকান ও ভাসমান দোকানকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজ চক্র সক্রিয় রয়েছে এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর কাছ থেকে। অভিযোগ রয়েছে, অল্প পুঁজিতে জীবিকা নির্বাহ করা অসহায় ভাসমান দোকানদারদের কাছ থেকে প্রতিদিন নিয়ম করে টাকা আদায় করা হচ্ছে এবং এসব টাকার একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে প্রভাবশালী মহল ও খোদ থানা পুলিশের কাছেও।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আমিন নামের এক ব্যক্তি নিজেকে হালিশহর থানার ক্যাশিয়ার ও পুলিশের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে হালিশহর থানার বিভিন্ন এলাকা থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে। তার অধীনে কয়েকজন মাঠপর্যায়ে টাকা সংগ্রহ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভাসমান দোকান থেকে চাঁদা আদায়
অভিযোগ অনুযায়ী নয়াবাজার মোড় থেকে ফুইল্ল্যাতলী বাজার পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে থাকা শতাধিক ভাসমান দোকান থেকে প্রতিদিন ৩০–৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। এতে দৈনিক প্রায় ৪,০০০ টাকা, মাসে প্রায় ১,২০,০০০ টাকা আদায় হয়।
ওয়াপদা মোড় থেকে এক্সেস রোড পর্যন্ত পশ্চিম পাশের ফুটপাতের দোকানগুলো থেকে লিটন নামের এক ব্যক্তি প্রতিদিন প্রায় ১,৫০০ টাকা সংগ্রহ করেন, যা মাসে প্রায় ৪৫,০০০ টাকা।
একই এলাকার উত্তর পাশের ফুটপাতের দোকানগুলো থেকে সাইফুল নামের এক ব্যক্তি প্রতিদিন প্রায় ২,৫০০ টাকা সংগ্রহ করেন, যা মাসে প্রায় ৭৫,০০০ টাকা।
বড়পোল মোড় ও এক্সেস রোড এলাকার ভাসমান দোকানগুলো থেকে পাখি ওলা নামে পরিচিত এক ব্যক্তি প্রতিদিন প্রায় ৭,০০০ টাকা সংগ্রহ করেন, যা মাসে প্রায় ২,১০,০০০ টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, এসব টাকা সংগ্রহের পর রাতে এগুলো ক্যাশিয়ার আমিনের কাছে জমা দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে বড়পোল মোড়ের মাহিন্দ্রা গাড়ির স্ট্যান্ড থেকে সোলেমান নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ২০,০০০ টাকা দেওয়া হয়।বড়ফুল পুলিশ বক্সের সামনে লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে পুলিশ বক্সে কর্মরত আলম এর মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ১৫,০০০ টাকা দেওয়া হয়।
চৌধুরীপাড়া ডগীর খালের জঙ্গল এলাকায় একটি জুয়ার আসর এবং সবুজবাগ এলাকায় আরও দুটি জুয়ার আসর থেকে মাসে প্রায় ৮০,০০০ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
হালিশহর এলাকার ভাঙারি দোকানগুলো থেকেও প্রতি দোকান থেকে মাসে ১,০০০ টাকা করে আদায় করা হয়।গাজার স্পট থেকে সর্বনিম্ন ৫,০০০ টাকা এবং ইয়াবা স্পট থেকে সর্বনিম্ন ১০,০০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
হালিশহর সাগরপাড় এলাকায় চোরাই তেলের দোকানগুলো থেকে প্রতি দোকান থেকে ৩,০০০ টাকা করে আদায় করা হয়, যা মাসে প্রায় ৬০,০০০ টাকা। এই এলাকায় ১৫ টিরও বেশি চোরাই তেলের দোকান রয়েছে বলে জানা গেছে,তাহলে প্রতি মাসে কত টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে এই অসহায় মানুষদের কাছ থেকে আপনারাই হিসাব করবেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্র দাবি করেছে, এসব কার্যক্রমের পেছনে হালিশহর থানার সেকেন্ড অফিসার এস আই মোশারফ এর নাম মাঠপর্যায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব কার্যক্রম চলছে বলে অনেকেই মন্তব্য করছেন।
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে এস আই মোশারফ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,আপনি যাদের নাম বলেছেন, আমি কাউকে চিনি না। অভিযোগ মিথ্যা। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব, সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এছাড়া মাঠপর্যায়ে যারা টাকা সংগ্রহ করেন এবং থানার একাধিক সোর্সের অডিও ও ভিডিও বক্তব্যও রয়েছে । ভিডিওগুলোতে তাদের বক্তব্য থেকে এমন ধারণা পাওয়া যায় যে, তারা নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে থানার সেকেন্ড অফিসার এস আই মোশারফ-এর আশ্রয়-প্রশ্রয় পাচ্ছেন বলে ইঙ্গিত দেন।
আমাদের হাতে থাকা ভিডিওতে এবং কয়েকটি ভয়েজ রেকর্ডে শোনা যায়, পুলিশের প্রতিনিধি পরিচয় দেওয়া আমিন বিভিন্ন দোকানে গিয়ে দোকানদারদের সাথে কথা বলছেন। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, আমি হালিশহর থানার ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব নিয়েছি, এখন থেকে সব কার্যক্রম আমার সাথে করবেন।
ভিডিওতে তার এই বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে ,কী ধরনের কার্যক্রম তার মাধ্যমে পরিচালিত হবে, যা দোকানদারদের তার সাথে করতে হবে। একই ভিডিওতে তাকে আরও বলতে শোনা যায়, আমি থানার ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব নিয়েছি, সেকেন্ড অফিসার জানে। প্রয়োজন হলে সেকেন্ড অফিসারের সাথে যোগাযোগ করবেন।
স্থানীয় দোকানদারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নিরাপত্তাজনিত কারণে তারা প্রকাশ্যে চাঁদা দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করতে চান না। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক দোকানদার নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং জানান, চাঁদা না দিলে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এবিষয়ে ভুক্তভোগী বিএনপির মহিলা দলের এক নেত্রী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) অভিযোগ করে বলেন,আওয়ামী লীগের সময়েও আমরা টাকা দিয়ে এখানে ব্যবসা করেছি, এখনও ব্যবসা করতে হলে টাকা দিতে হচ্ছে। আমরা বিএনপি করি, কিন্তু চাঁদা দেওয়ার জন্য আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বিএনপিরই কিছু লোক। ফুটপাত ও রাস্তার চাঁদা নিয়ে আমার সাথে আদালতে মামলাও চলছে। আমি চাঁদা দিতে অস্বীকার করে প্রতিবাদ করায় আমার দোকানের এক কর্মচারীর ওপর হামলা করা হয়েছে। বিষয়টি আমি মাননীয় এমপি সাহেবকে জানিয়েছি। তিনি বর্তমানে ঢাকায় আছেন, চট্টগ্রামে এসে বিষয়টি দেখবেন বলে আমাকে আশ্বস্ত করেছেন।
এ বিষয়ে হালিশহর থানার ক্যাশিয়ার ও পুলিশের প্রতিনিধি পরিচয় দেওয়া আমিন-এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমি থানার ক্যাশিয়ার নই, ক্যাশিয়ার অন্য একজন। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না, এবং যাদের কথা বলা হচ্ছে তাদের কাউকেই আমি চিনি না।
তবে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, হালিশহর থানার সেকেন্ড অফিসারসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সাথে তার পরিচয় ও যোগাযোগ রয়েছে এবং তাদের হয়ে তিনি কিছু কাজ করেন বলেও জানান। তবে সেই কাজের প্রকৃতি সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি। সব অভিযোগ অস্বীকার করলেও আলাপচারিতার এক পর্যায়ে তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন সাংবাদিক তাকে ফোন দিয়ে নানা ধরনের হুমকি দেন। তবে কেন সাংবাদিকরা তাকে ফোন দেন বা কী কারণে তাকে হুমকি দেওয়া হয় ,এ প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দেননি এবং বিষয়টি এড়িয়ে যান। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি প্রতিবেদককে চা খাওয়ার প্রস্তাব দেন।
বিষয়টি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ,কেন সাংবাদিকরা তাকে ফোন দেন, কী কারণে তাকে হুমকি দেওয়া হয় এবং পুরো বিষয়টির পেছনে আসলে কী ঘটছে ,এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে হালিশহর থানার অফিসার ইনচার্জ আহসান বলেন,ভাসমান দোকানদাররা গরিব মানুষ। তাদের কাছ থেকে কেউ টাকা নিলে সেটা মেনে নেওয়ার মতো নয়। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হবে।
অন্যদিকে উপ-পুলিশ কমিশনার (পশ্চিম) আলমগীর বলেন,বিষয়টি আগে শুনিনি। আপনার কাছে যদি কোনো ভিডিও বা ডকুমেন্ট থাকে, আমার কাছে পাঠান। প্রমাণ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি শুধু চাঁদাবাজি নয় এটি দরিদ্র মানুষের জীবিকার উপর সংগঠিত অবৈধ অর্থ আদায়ের একটি বড় চক্র। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।