
বিশেষ সংবাদদাতা
সমুদ্র বাণিজ্যে বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) বহরে দু’টি নতুন জাহাজ ‘বাংলার নবযাত্রা’ ও ‘বাংলার প্রগতি’ যুক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই যুক্তরাষ্ট্রের হেলেনিক ড্রাই বাল্ক ভেঞ্চারস এলএলসি নামে কোম্পানির কাছ থেকে জাহাজ দুটি কেনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভ্যালুয়ারদের মাধ্যমে যাচাইকৃত জাহাজের প্রাক্কলিত মূল্য ছিল ৪০.২ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু বিএসসি প্রতিটি জাহাজ কিনেছে ৩৮.৩৪ মিলিয়ন ডলারে। ফলে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে। ইতোমধ্যেই জাহাজ দুটি ৫০ কোটি টাকা আয় করেছে। এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আগামী ৬ থেকে ৭ বছরের মধ্যেই বিনিয়োগকৃত সম্পূর্ণ অর্থ উঠে আসবে। বিএসসির এই সাফল্যের মধ্যেও ছড়ানো হচ্ছে অপতথ্য। বলাবলি করা হচ্ছে- জাহাজের ১৩৫টি টেকনিক্যাল প্যারামিটার বিবেচনায় ৩২-৩৩ মিলিয়ন ডলার জাহাজ কেনা হয়েছে, যার কোনো দালিলিক ভিত্তি নেই বলেও জানিয়েছে বিএসসি। বিএসসি তার ৫৪ বছরের ইতিহাসে নিজস্ব অর্থায়নে ও সক্ষমতায় এই দু’টি জাহাজের অর্জনকে তার সর্বোচ্চ বাণিজ্যিক সাফল্য বলে বিবেচনা করে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) জানায়, ‘বাংলার নবযাত্রা’ ও ‘বাংলার প্রগতি’ নামের নতুন দুটি বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজে উন্নত প্রযুক্তি ও বিশ্বমানের ইক্যুইপমেন্ট রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন জাহাজ দুটিতে এনইসিএ বিধিমালা অনুসরণ করে নির্মিত হয়েছে। এখানে গ্রিন হাউস গ্যাস (জিএইচজি) নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর। জাহাজ দুটি চীনে নির্মিত হলেও এর প্রধান যন্ত্রপাতিসমূহ ওয়েস্টার্ন এবং জাপানি অরিজিনের। এগুলো এরোডাইনামিক শেপ এবং ডুয়েল ফুয়েল রেট্রোফিট সম্পন্ন। যা বিএসসির অন্যান্য জাহাজের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উন্নত এবং ব্যাপক জ্বালানি সাশ্রয়ী। বিএসসি জানায়, জাহাজ দুটি বহরে যুক্ত হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক রুটে সফলভাবে বাণিজ্যিক পরিচালনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, আইভরিকোস্টসহ বিভিন্ন দেশের পোর্ট স্টেট কন্ট্রোল (পিএসসি) ও ক্লাসের প্রতিটি ইন্সপেকশনে ‘জিরো ডেফিসিয়েন্সি’ ডিক্লেয়ারের মাধ্যমে জাহাজ দুটির উচ্চ গুণগত মানের বিষয়টিও জানান দিয়েছে। জাহাজ দুটি কিনতে প্রতিষ্ঠানটির খরচ হয়েছে ৭ কোটি ৬৬ লাখ ৯৮ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ৯৩৫ কোটি টাকার মতো। জাহাজ দুটি থেকে বছরে ১৫০ কোটি টাকা আয় হবে বলে আশা করছে বিএসসি।
জাহাজ পরিচালনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান বিএসসি দেশীয় পণ্য পরিবহনের চেয়ে ভিন্ন দেশের পণ্য পরিবহনে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে আসছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাহাজ ভাড়ার মাধ্যমে ২৮৯ কোটি ৫০ লাখ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩২১ কোটি ৭৯ লাখ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ২৯৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা আয় করেছে। বিএসসি গত অর্থবছরে ৮০০ কোটি টাকা আয়ের সাফল্য দেখিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি। নিট মুনাফা করেছে ৩০৬ কোটি টাকা। যা সংস্থার ৫৪ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সাফল্য বলে মনে করছেন বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক।
সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে বিএসসির বহরে যুক্ত হওয়া ‘বাংলার নবযাত্রা’ ও ‘বাংলার প্রগতি’ দু’টি নতুন জাহাজের ক্রয়মূল্য, গুণগতমান এবং সংগ্রহ প্রক্রিয়া নিয়ে যে তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপপ্রয়াস উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটি। শুধু তাই নয়, বিএসসির বক্তব্যকে খণ্ডিতভাবে প্রতিবেদনটিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। সারফেস ওয়েবের কিছু অসত্য তথ্য ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
শুক্রবার (০৩ এপ্রিল) প্রকাশিত প্রতিবেদনের টু দ্য পয়েন্টে প্রতিবাদ জানিয়ে বিএসসি তুলে ধরেছে ঘটনার প্রকৃত সত্য। তাঁরা বলছে- প্রাতিষ্ঠানিক ও সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাহাজ দুটি কেনা হয়েছে। বিএসসির জাহাজ অর্জন বা ক্রয় প্রক্রিয়া কোনো একক ব্যক্তি বা বিভাগের সিদ্ধান্তের ওপর বর্তায় না। প্রতিটি ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পৃথক টেকনিক্যাল কমিটি, টেন্ডার কমিটি, প্রাক্কলন কমিটি এবং ক্লাস সার্ভেয়ারদের সমন্বয়ে একাধিক ধাপ পার হতে হয়। পরবর্তীতে পিডিপিপি ও ডিপিপি প্রণয়ন, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট অন্য ১২টি মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন এবং সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন গ্রহণ করা হয়। বিএসসি জানায়, বায়ার সুপারভাইজারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ ও কমিটির চূলচেরা বিশ্লেষণের পর সরকারি ও থার্ড পার্টি সকল যাচাই-বাছাই ও ইন্সপেকশন শেষে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গেই এই জাহাজগুলো গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক এই সম্মিলিত প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে কোন ব্যক্তিবিশেষের চরিত্রহনন করা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভ্রান্তিকর