1. editor@purbobabgla.net : Web Editor : Web Editor
  2. admin@purbobangla.net : purbabangla :
  3. jashad1989@gmail.com : Web Editor : Web Editor
শেখ হাসিনার রাজনীতির ‘ডিএনএ’ টেস্ট এবং নিয়তির ঘড়ি - পূর্ব বাংলা
বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৯ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ

শেখ হাসিনার রাজনীতির ‘ডিএনএ’ টেস্ট এবং নিয়তির ঘড়ি

পূর্ব বাংলা ডেস্ক
  • প্রকাশিত সময়ঃ মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬৪ বার পড়া হয়েছে

নিয়াজ মাহমুদviber sharing buttonwhatsapp sharing button

১৭ নভেম্বর—বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে এই দিনটি যেন বারবার ফিরে আসে,বারবারই অনিবার্য এক নাটকের পর Curtain Call টানতে চায়। ১৯৬৭ সালের ১৭ নভেম্বর ড. ওয়াজেদ মিয়া আর শেখ হাসিনার বিয়ের দিন। ২০২৫ সালে একই দিনে ঘোষণা হলো হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের রায়। ইতিহাস কি কাকতাল? নাকি নিয়তি এতটাই নির্মম? হাসিনা একসময় বলেছিলেন—“মানুষের নিয়তি সে নিজেই লেখে।” আজ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে না পারলেও, সেই “লেখা” যেন তার দিকে ফিরে এল ঘূর্ণিঝড় হয়ে।

এই রায় শুধু একটি বিচারিক ঘোষণা নয়—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্মৃতিকে টেনে নিয়ে গেল বিচারালয়ের কাঠের বেঞ্চে। আর সেই বেঞ্চে, আজ বিচারাধীন হলো পুরো একটি যুগ, একটি শাসনদর্শন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার ছক। ট্রাইব্যুনাল বলেছে—হাসিনার তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত। দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড। আর সেই অভিযোগগুলো? এগুলো কোনও সাধারণ রাজনৈতিক দুর্নীতি নয়—এগুলো নিরস্ত্র নাগরিকের ওপর রাষ্ট্রীয় দমন, গণহত্যার আয়োজন, হত্যা বা হত্যার অনুমোদনের অভিযোগ।

হাসিনা পালিয়ে গেছেন দিল্লিতে। দেশ তাকে ডাকছে আদালতে, কিন্তু আদালতের রায় তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ইতিহাসের এমন এক পাতায়, যেখান থেকে ফিরতি পথ খুব কম মানুষই খুঁজে পায়।

বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন নতুন কিছু নয়। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান—যেখানে ছাত্র, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ মিলে গড়েছিল এক ঈষৎ বিস্ফোরিত তরুণ-বিদ্রোহ—সে বিদ্রোহকে স্তব্ধ করতে যে নৃশংসতা চালানো হয়েছিল, সেগুলোর ছবি, ভিডিও, লাশের ওপর আঘাত, হাসপাতালের দরজায় পুলিশি চেকপোস্ট—সবই ফিরে এসেছে আজকের রায়ে ভূত হয়ে। হাসিনা একসময় বলতেন—
“বাংলাদেশের মানুষের চোখে চোখ রেখে চলার ক্ষমতা আমার আছে।” আজ সেই চোখের ভাষাই রায়ের মূলে, যেখানে আছে একেকটি লাশের নীরব সাক্ষ্য, হাসপাতালের করিডরে মায়ের কান্না, এবং তরুণদের ছিন্নভিন্ন অস্থির দেহ।

এখানেই বিতর্ক সবচেয়ে জটিল। বিচার কি সত্যিই নিরপেক্ষ? নাকি এই রায় রাজনৈতিক প্রতিশোধের সুরে বাজছে? হাসিনার পক্ষ বলছে—“এই ট্রাইব্যুনাল নাকি একটি রাজনৈতিক অস্ত্র।” আন্তর্বর্তী সরকারের ওপর অভিযোগ—“ইউনূসের নেতৃত্বে দলটিকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা।” সজীব ওয়াজেদ জয়ের হুমকি—“আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে দেশে সহিংসতা হবে।”

অন্যদিকে সরকারের মুখপাত্র বলছে—“রাজনৈতিক প্রভাব নেই। এটি ন্যায়বিচার, accountability।”

তবু একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না—স্বাধীনতার ৫৪ বছরে প্রথমবার, বাংলাদেশের কোনও সাবেক ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের রায় পেলেন। এটি এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত—চাই সে ন্যায়বিচারের বিজয় হোক।

ভারতীয় বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা মিডিয়ার বেশিরভাগ সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষকরা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এই রায় কে বাংলাদেশের জনগণের বিজয় হিসাবে দেখছে।

ওদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ১৭ নভেম্বর জেনেভা থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা গত বছর বিক্ষোভ দমনের সময় সংঘটিত গুরুতর লঙ্ঘনের শিকারদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমাদের তথ্য-অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে, আমরা অপরাধীদের—কমান্ড এবং নেতৃত্বের পদে থাকা ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক মান অনুসারে জবাবদিহি করার আহ্বান জানিয়ে আসছি। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যদিও আমরা এই বিচার পরিচালনার সাথে ছিলাম না, তবুও আমরা ধারাবাহিকভাবে সকল জবাবদিহিতামূলক কার্যক্রম, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগে যথাযথ প্রক্রিয়া এবং ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করার পক্ষে বলে আসছি। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যখন, এখানে যেমনটি ঘটেছে, বিচারকাজ দায়ী ব্যক্তিদের অনুপস্থিতিতে এবং মৃত্যুদণ্ডের দিকে পরিচালিত হয়েছে। আমরা মৃত্যুদণ্ড আরোপের জন্যও দুঃখ প্রকাশ করছি, যেটা আমরা সকল পরিস্থিতিতেই বিরোধিতা করি।

রাজনীতি কখনোই কাগজে লেখা ঘোষণাই নয়। এটি থাকে রাষ্ট্রযন্ত্রের হাড়-মজ্জায়, মানুষের যৌথ স্মৃতিতে।
হাসিনার শাসন, উন্নয়ন, স্বৈরতন্ত্র, একদলীয় প্রভাব, বিচার অস্বচ্ছতার অভিযোগ—সবকিছুই আজ ছিন্নভিন্ন হয়ে আদালতের টেবিলে পড়ে রইল।

প্রতিটি রাষ্ট্রিয় গুলি, প্রতিটি রাতের গ্রেপ্তার, প্রতিটি নিখোঁজ, আজ ফিরে এসেছে আদালতের রায়ে—তার নিজের সৃষ্ট সেই ট্রাইব্যুনাল, যা ২০১০ সালে তিনি গড়েছিলেন অপরাধীদের বিচারের নামে, আজ সেই আদালতেই বিচার পেলেন তিনি নিজে।

ইতিহাসকে এতটা ব্যঙ্গাত্মক হতে হয়? হয়। ক্ষমতা যখন ধর্ম হয়ে যায়, দেশ যখন মানুষের নয়—দলের হয়ে যায়, তখনই অতীত ফিরে আসে হাতুড়ি হাতে।

ভারত তাকে ফেরৎ দেবে না—এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির অপ্রিয় সত্য। ভারতের কাছে হাসিনা কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; দিল্লির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক বিনিয়োগ। তাকে ফেরত দিলে ভারতের রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান দুলে যাবে, আর দেশের-বাইরে প্রশ্ন উঠবে—“দোষী সাব্যস্ত এক নেত্রীকে সুরক্ষা না দেওয়া কি গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে যায়?” অতএব, দিল্লি তাকে রাখবে। আর বাংলাদেশ চিৎকার করবে।
এটাই চলবে!

এই রায়ের মতো ঘটনা ইতিহাস বদলায়—কিন্তু রাষ্ট্র কি বদলায়? ক্ষমতার প্রবাহ কি আলাদা পথে যায়?
মানুষ কি ভয় পাবে, নাকি সাহসী হবে? বাংলাদেশ আজ দুই বিপরীত ধারায় দাঁড়িয়ে—একদিকে নির্যাতিত মানুষের প্রতিশোধের ন্যায়চিন্তা, নিরাপত্তা বাহিনীর অতীত দমননীতি, সরকারি অপব্যবস্থার বিচারের নতুন লাইন।

অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুন, দল-বিরোধের সুর, আর একটি নতুন শাসনযন্ত্রের সম্ভাব্য ভয়।

যে রাষ্ট্র মৃত্যুদণ্ড দেয়, তারও হিসাব রাখতে হয়—আগামী বছর সেই রাষ্ট্রক্ষমতা কার হাতে যাবে?

হাসিনার রায় রাজনৈতিক, বিচারিক, নৈতিক—সব দিক থেকেই এক ভূমিকম্প। এটি অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু এটাও সত্য—যে কোনো শাসকের শেষ বিচার আদালতে নয়—মানুষের স্মৃতিতে, মানুষের রক্তাক্ত ইতিহাসে, মানুষের চেতনার গভীরে।

এর আগে ১৯৭১ এর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকার্য চলাকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা সালাহ কাদের চৌধুরী একবার বলেছিলেন, ‘জজ সাহেব! এই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যেন চালু থাকে, এখানে একদিন হাসিনারও বিচার হবে…।’ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঠিক ১০ বছর পর যখন এই ট্রাইব্যুনালেই হাসিনার ফাঁসির রায় দেওয়া হয় তখন তার সেই ঐতিহাসিক উদ্ধৃতি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়।

কাসিমপুর কারাগারে কয়েকমাস বন্দী ছিলেন এক সময়ের আলোচিত আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি গোলাম মাওলা রনি। সেই সময় একই কারাগারে ছিলেন জামায়াত নেতা কাদের মোল্লাসহ অনেক ‘ভিভিআইপি’ বন্দী। কাদের মোল্লার সাথে কাটানো কিছু সময় নিয়ে সাবেক এমপি রনি স্মৃতিচারণ করে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন তখন ফেসবুকে। রনি বলেন, আমার কাছে লিখা কাদের মোল্লার চিরকুট কাহিনী। তিনি লিখেছেন- প্রিয় রনি, যদি কখনও সময় পাও এবং তোমার ইচ্ছা হয় তবে আমার ফাঁসির পর একবার হলেও বলো বা লিখো- কাদের মোল্লা আর কসাই কাদের এক ব্যক্তি নয়। আমার আত্মা কিয়ামত পর্যন্ত কাঁদবে আর কসাই কাদের তখন কিয়ামত পর্যন্ত অট্টহাসি দিবে।

একজন নেত্রীর জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন—তার বিয়ের দিন—আর সবচেয়ে অন্ধকার দিন—
তার মৃত্যুদণ্ডের দিন—একদিনেই এসে থামল।

এটাই ইতিহাসের নির্মম ব্যঙ্গ। এটাই রাজনীতির উল্টো-পিঠ। এটাই সেই ভয়ানক সত্য—ক্ষমতা কারো বন্ধু নয়। ক্ষমতা শুধু রেকর্ড রাখে—কর্মের।লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন-
এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2021 purbobangla