উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় যে তরুণ তার সতীর্থ স্কুল ছাত্রদের সংগঠিত করে বঙ্গবন্ধুর ছবি ও ফুল নিয়ে মিছিল সহকারে ‘জেলের তালা ভাঙ্গব, শেখ মুজিবকে আনব’, ‘আইয়ুব মোনায়েম ভাই ভাই, একরশিতে ফাঁসি চাই’, ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার কর, করতে হবে’ -স্লোগানে স্লোগানে পটিয়া সদরকে কাঁপিয়ে দিতেন, সেই তরুণ সেখানে থেমে থাকেন না; ৬৯, ৭০, ৭১ (মার্চ পর্যন্ত) এই তিনবছর পটিয়ার রাজপথে সমগ্র আন্দোলন- সংগ্রামে তরুণ সমাজের মধ্যমণি হয়ে বিরাজ করেন। সময়ের সেই সাহসী সন্তানের নাম চৌধুরী মাহাবুবুর রহমান।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে পূর্ব বাংলাকে মুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশ কায়েমের জন্য ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানের কলোনিয়াল জোঁয়াল ছুঁড়ে ফেলার জন্য যে ধারাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রাম আরম্ভ করেছিলো, তারই পরিণতিতে ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ৭০-এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করার পরও ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বাংলার জাগ্রত জনতার ওপর গণহত্যা আরম্ভ করলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করে সেই স্বাধীনতা রক্ষার করার জন্য বাঙালি জাতিকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলার মাটি থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বিতাড়িত করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানালে জাতি ৭১-এর ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রাণকেন্দ্র পটিয়াকে যাঁরা পটিয়াকে পাকিস্তানি সৈন্যদের জন্য আতঙ্কের জনপদে পরিণত করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী মাহাবুবুর রহমান।
৭১-এর ৮ এপ্রিল পটিয়া থেকে ৬১ জনের একটি দলের সঙ্গে তিনি চট্টগ্রাম থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে গমন করেন এবং আগরতলার শৈলশিখরে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বগাফায় প্রথম প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দেশে এসে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেন। তিনি যখন ট্রেনিং নিতে যান, সেটাই ছিলো বগাফা থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম ব্যাচ। তখনো হরিণা ক্যাম্প এবং সেখানে ১নং সেক্টর হেডকোয়ার্টার ও ইয়ুথ ক্যাম্প চালু হয়নি; দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ যুদ্ধ চলছিলো। রামগড় ছিলো মুক্তিযোদ্ধার দখলে। এই সময় যিনি প্রথম ট্রেনিং নিয়ে প্রথম মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন, তিনি হচ্ছেন বর্তমানে পটিয়ার প্রবীণ রাজনীতিবিদ চৌধুরী মাহাবুবুর রহমান। এতক্ষণ তাঁরই কথা বলা হলো। বর্তমান পটিয়া পৌরসভার অন্তর্গত নবাবী আমলের জমিদার হাদু চৌধুরীর বংশে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে চৌধুরী মাহবুবুর রহমানের জন্ম।
৭০-এ পটিয়া থেকে নির্বাচিত এম এন এ ও স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর কেবিনেটের সদস্য অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী তাঁর চাচা। তাঁর পিতার নাম আবদুল আলীম চৌধুরী, মাতা রাবেয়া খাতুন চৌধুরী, পিতামহ গুরা মিয়া চৌধুরী, পিতামহী ওমদা খাতুন।
পাকিস্তানের ডিক্টেটর আইয়ুবের গণবিরোধী স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ৬ দফা-১১ দফা ভিত্তিক আন্দোলনের সাথে আগরতলা মামলা বাতিলের দাবি যুক্ত হয়ে প্রচণ্ড গণআন্দোলনের সূচনা করে। সেই গণআন্দোলনে স্কুলের সেই ছাত্রদের নিয়ে জনাব মাহাবুবুর রহমান পটিয়া, কেলিশহর ও ধলঘাট স্কুলে গিয়ে ছাত্রদের নিয়ে পটিয়া আসতেন। তারা পটিয়ার বিভিন্ন স্থানে বঙ্গবন্ধুর ছোট একটি প্রতিকৃতি নিয়ে ফুলঘর থেকে এক আনা দিয়ে ফুল কিনে মালা তৈরি করে সভা-মিছিল করতেন। তখন স্লোগান ছিল বঙ্গবন্ধু আগরতলা মামলায় বন্দী ছিলেন। তাঁর মুক্তি এবং ছয় দফা ও এগার দফা বাস্তবায়নের দাবিতে তারা ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’, ‘আইয়ুব-মোনায়েম ভাই ভাই এক রশিতে ফাঁসি চাই’ ইত্যাদি স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করে পটিয়া প্রদক্ষিণ করতেন। তাদের মিছিলে সিনিয়র ছাত্রনেতা চৌধুরী সিরাজুল ইসলাম খালেদ, আহমদ নূর, মোতাহেরুল ইসলাম চৌধুরী, জালাল উদ্দিন আহমদ, বদিউর রহমান মাস্টার, মোহাম্মদ আলী, আফজল, কবির আহমদ, নুরুল আলম, তোজাম্মেল হোসেন, অধ্যাপক আবদুল আলিম, এস এম তসলিম মাহবুব, এ কে এম আবদুল মতিন চৌধুরী, নুরুল আফসার চৌধুরী প্রমুখ অংশ নিতেন। সামশুদ্দিন আহমদ তখন জেলে। একবার হরতালের সময় তারা দোহাজারী ট্রেন আটকে গ্লাস ভেঙে দেন।
১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে পটিয়া থানা ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং উক্ত সম্মেলনে চৌধুরী সিরাজুল ইসলাম খালেদ সভাপতি ও সামশুদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে পটিয়া থানার ছাত্রলীগের নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে চৌধুরী মাহাবুবুর রহমান সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ ভূষি স্কুল শাখা ছাত্রলীগের কমিটি গঠিত হলে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন।
১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত নির্বাচনে পটিয়া থেকে জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন লাভ করেন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী এবং প্রাদেশিক পরিষদে মনোনয়ন লাভ করেন সুলতান আহমদ কুসুমপুরী। আওয়ামী লীগের জন্য এ নির্বাচনে জয়লাভ করা খুবই প্রয়োজন ছিল। কারণ নির্বাচন হচ্ছিল ছয় দফার ওপর। পটিয়া নির্বাচনী এলাকায় সংখ্যালঘুদের খুব প্রভাব ছিল। প্রাদেশিক পরিষদে সুলতান আহমদ কুসুমপুরী স্বল্প পরিচিত নেতা এবং ন্যাপের প্রার্থী পূর্ণেন্দু দস্তিদার জনপ্রিয় প্রার্থী হওয়ায় কুসুমপুরীর বিজয় সম্পর্কে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। সেজন্য আওয়ামী লীগের সাথে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও এলাকার জনগণের ঘরে ঘরে গিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালান। মাহাবুবুর রহমান ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে যেমন তেমনি অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরীর ভাতিজা হওয়ায় তাঁকে নির্বাচনে অধিক পরিশ্রম করতে হয়েছিল। তিনি আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিজয়ী করার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করেন।
৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে নৌকার পক্ষে তারা কার্যক্রম চালান। ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আনোয়ারায় মরহুম আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু মিয়ার পক্ষে কাজ করার জন্য চৌধুরী মাহবুব তাঁর ভাগ্নে মোরশেদুল আলম, জহুরুল হক চৌধুরী, আবদুস সালাম চৌধুরী, শামসু ফারুকী প্রমুখ বাবু মিয়ার বড় বোনের নির্দেশে (বর্তমানে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান আলহাজ সাইফুল আলম মাসুদ এর মা) আনোয়ারায় গমন করেন। নির্বাচন শেষে ৩ জানুয়ারি ১৯৭১ সকল এমএনএ এমপি-এদের বঙ্গবন্ধু শপথ গ্রহণ করান। সে অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে তারা অনেকে পটিয়া থেকে ঢাকায় গিয়েছিলেন। পাকিস্তানি সামরিক চক্র বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করবে না বিধায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে বিভিন্ন কলাকৌশল শুরু করে। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ ঘোষণা দিলে সমগ্র জাতি স্বাধীনতার দাবিতে রাজপথে ফেটে পড়ে।
মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশে রূপান্তরিত হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তান সরকার ও প্রশাসন কার্যত অচল হয়ে পড়ে এবং প্রশাসন পরিচালিত হতে থাকে আওয়ামী লীগের নির্দেশে। বঙ্গভবন আর ক্যান্টনমেন্ট ছাড়া কোথাও পাকিস্তানের পতাকা ওড়েনি। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি হায়েনারা অপারেশন সার্চলাইটের নামে গণহত্যার নীলনকশা নিয়ে বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তারা রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা ইপিআর ঘাঁটি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। ইপিআর, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে এবং স্বাধীনতাকামী বাঙালি ছাত্র-জনতা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো যার যা আছে তাই নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে রুখে দাঁড়াতে প্রতিরোধ যুদ্ধ আরম্ভ হয়।
২৬ মার্চ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পাবর্ত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত থেকে যে সমস্ত ইপিআর ক্যাপ্টেন রফিকের নির্দেশে বিদ্রোহ করে শহরের দিকে আসছিলো, তাদেরই কিছু অংশ পটিয়া কলেজেও আশ্রয় নেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও ছাত্ররা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করেন। বালিকা বিদ্যালয়ে রান্না করা হতো। পটিয়া বিদ্যুৎ বিভাগের একটি পিকআপ-যোগে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রসহ অন্যান্য জায়গায় চৌধুরী মাহাবুব, সুলতান মেম্বার খাবার নিয়ে যেতেন। পিকআপটি ড্রাইভার নুরু চালাতেন। একদিন চৌধুরী মাহাবুব চাচা অলি চৌধুরীর এয়ারগান নিয়ে পটিয়া কলেজে গেলে তা দেখে একজন ইপিআর এর সৈনিক তাঁকে বলেন ‘এয়ারগান দিয়ে তো যুদ্ধ হবে না, আপনি রাইফেল চালানো শিখে নেন’। অতঃপর একজন ইপিআর এর সৈনিকের কাছ থেকে চৌধুরী মাহাবুব রাইফেল চালনা শিখে নেন। কয়েকদিন পর পটিয়া এগ্রিকালচার এস্টেট হতে একটি ট্রাক্টর যোগে প্রায় পঁয়ষট্টিজনের মত ছাত্র ভারতীয় সীমান্তের পথে যাত্রা শুরু করেন। রামগড়ে পৌঁছার পূর্বে রাত্রে তারা নাজিরহাট কলেজে অবস্থান করেন।
৮ এপ্রিল ঐখানে বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা প্রায় ১০০ জন ছাত্রের ১টি দল ভারতের বগাফা বিএসএফ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ৯ এপ্রিল থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে রামগড় হয়ে অধ্যাপক শামসুল ইসলাম (দক্ষিণ চট্টগ্রামে ভারত থেকে আগত প্রথম গ্রুপ কমান্ডার) নেতৃত্বে দেশে ফিরে আসেন। এ সময় তাদের সঙ্গে ছিলেন সামশুদ্দীন আহমদ, এ কে এম আবদুল মতিন চৌধুরী , ইউসুফ খান, হুলাইন ছালেহ-নূর কলেজের আসলাম ও রফিক খান , মনসার ইউসুফ চৌধুরী (আমেরিকা প্রবাসী), পটিয়ার গাজী আবদুস সবুর, কবির আহমদ, আবুল কালাম, এস এম আবুল কাশেম রাজা ও এস এম নুরুল আলমসহ আরও কয়েকজন। তারা ফিরে এসে দেখেন পাকিস্তানি বাহিনী জঙ্গি বিমান থেকে পটিয়ায় বোমা বর্ষণ করেছে। থানার সম্মুখে মসজিদ ক্ষতিগ্রস্থ এবং হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার সৈয়দ মারা গেছেন জানতে পারেন। তাদের সাথে কমান্ডারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
কয়েকদিন পর চৌধুরী মাহাবুব, মনসার নুরুল ইসলাম, বড়লিয়ার আ ক ম শামসুজ্জামান (বর্তমানে পটিয়া থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি), খরনার নুরুল আবছার চৌধুরী, পূর্ব পাঁচরিয়ার আবদুস সবুর, মোহাম্মদ ইউসুফ সহ আটাশ ত্রিশ জন ছাত্র কমলাছড়িতে বাঘাইয়ার বাড়িতে পৌঁছান। সেখানে তাঁরা লাঠি আলিম, থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হামিদুর রহমান, ছাত্রলীগের সৈয়দসহ অনেককে দেখতে পান। চৌধুরী মাহবুব ও মনসার নুরুল ইসলাম ছাত্রলীগ কর্মীদের সংগ্রহ করে আরেকটি গ্রুপ ভারতে পাঠানোর জন্য পরের দিন পটিয়ায় চলে আসেন। ভারতের উদ্দেশ্যে যাত্রাপথে প্রতিপক্ষের গুলিতে এয়াকুবদন্ডির হারুন শহীদ হন।
এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে চৌধুরী মাহাবুবের গ্রেনেড চার্জ :
০৫/০৬/১৯৭১ এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে পটিয়ার ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মরহুম আনোয়ার উদ্দিন মাহাবুবকে পটিয়া পোস্ট অফিসের সামনে পেয়ে তাঁকে এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্রে গ্রেনেড চার্জ করবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি সাথে সাথে রাজি হয়ে আনোয়ার সাহেবের সাথে গ্রেনেড আনতে যান। তিনি চৌধুরী মাহবুবকে বর্তমান এস আলম গ্রুপের মালিকের পড়ার রুমে বসালেন। ততক্ষণে আনোয়ার সাহেব গ্রেনেড ও গামছা নিয়ে বাহুলীর বিমান বাহিনীর সার্জেন্ট শামসুসহ উপস্থিত হন। ইতিমধ্যে এস আলম এর মা তাদের ভাতের ব্যবস্থা করে তাদের দেখতে আসেন। তিনি দেখে ‘এ তো আমার মাহাবুব’ বলে কান্নাকাটি শুরু করলেন। উল্লেখ্য যে, তাঁর বড় ছেলে মোর্শেদুল আলমের সাথে ভাই ডাকাডাকির সুবাদে তিনি তাঁকে অনেক আগে থেকেই মা ডাকতেন । তাই তিনি তাঁর গর্ভধারিনী মা না হয়েও তাঁর জননী কেননা, আমৃত্যু তিনি মাতৃস্নেহে চৌধুরী মাহাবুবের পরিবারের সমস্ত কিছু তদারক করে গেছেন। অতঃপর আনোয়ার সাহেব চৌধুরী মাহাবুব আর বিমান বাহিনীর শামসু সাহেবের কোমরে গামছা দিয়ে গ্রেনেড বেঁধে দিলে তারা রাহাত আলী স্কুলের সামনে নুরুছফা সওদাগরের দোকানের পিছনে গিয়ে দাঁড়ান, সেখানে শামসু সাহেব প্রশ্রাব ত্যাগের ভাঙ্গিমায় বসে মাহাবুবকে থানায় কর্মরত পুলিশরা তাদের দেখেছে কিনা দেখার জন্য বলেন। তিনি না বলার সাথে সাথে শামসু সাহেব গ্রেনেড ছুঁড়ে মারলেন, চৌধুরী মাহবুবও ছুঁড়ে মারলেন। বিষ্ফোরণ ঘটার সাথে সাথে পাঞ্জাবিরা অস্ত্রসমেত স্কুলে ঢুকে যায় । শামসু সাহেব গ্রেনেড মেরেই হাওয়া হয়ে যান। পরিচিত এক রাজাকার রশীদ (যাকে মোহাম্মদপুরের ৫নং গ্রুপ কমান্ডার এস এম আবুল কাশেম খবরাখবরের জন্য নিয়োজিত করেছিলেন।) চৌধুরী মাহাবুবকে কেন এসেছেন জিজ্ঞেস করলে তিনি তাঁর চাচাতো বোন মঞ্জু পরীক্ষা দিচ্ছে বলে জানান। রশীদ তাঁকে ডাকবাংলো পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। তখন মাহবুব ষ্টেশন রোড হয়ে বালিকা স্কুলের পাশ দিয়ে মুন্সেফ বাজারে পৌঁছান। ছাত্র ইউনিয়নের শাহ আলম, সিও রেভিনিউ অফিসের মজিদ মিয়ার ছেলে দুলাল সহ মুন্সেফ বাজার থেকে বাসে উঠে মনসা নামেন। কিছুক্ষণ পর আরেকটি বাসে করে গৈড়লার টেকে যান। রাতে অবস্থানের জন্য নাইখাইন গ্রামের মাষ্টার মফজলের বাড়িতে যান। কিন্তু মফজল মাষ্টার তার বাবার চাকরি থেকে আসার সময় হয়েছে, তাদের দেখলে ক্ষতি হতে পারে জানালেন, তার পিতা ছিল মুসলিম লীগের সমর্থক। তারা দ্রুত চলে যাও বলে বিদায় দেন’। তাদের কথোপকথনের সময় এক ভদ্রলোক ডিফেন্স পার্সন পরিচয় দিয়ে ২৫ মার্চের পূর্বে ছুটি নিয়ে এসেছেন বলে জানালেন, তার জন্য তৈরি করা রুটি থেকে চিনি দিয়ে তাদের তিনজনকে তিনটি রুটি খেতে দিয়েছিলেন। তারা গৈড়লা ও ডেঙ্গাপাড়া সংযোগস্থলে একটা ছোট নৌকা দেখতে পেলেন, যাতে কেউ ছিল না। নৌকাটিকে কিছু উপরে টেনে নিয়ে বসে থেকে রাত কাটিয়ে ভোরে যে যার বাড়িতে চলে যান। সকাল দশটায় তার চাচা প্রাক্তন মন্ত্রী অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরীর ঘাটে জহির চৌধুরী, সালাম চৌধুরী, আহমদ ছফা চৌধুরী, আবদুস ছোবান সহ পূর্ব দিনের আলাপ সারলেন। এ সময় বাড়ির পিছন থেকে কমান্ডার শামসুদ্দিন আহমদ পটিয়ার আবদুল লতিফ ভেট্টাকে নিয়ে উপস্থিত হন। তখন শামসুদ্দিন আহমদ বললেন, ‘কি গ্রেনেড ফুটালি তোরা আমরা বাড়িতে থাকতে পারছি না’। তার সাথে যুদ্ধে যাবেন কিনা জানতে চাইলে চৌধুরী মাহাবুব সাথে সাথে রাজি হয়ে যান। এসময় আবদুল লতিফ ভেট্টা চলে যায়। আহমদ ছফা, জহির, সালাম অস্ত্র আনার পর যুদ্ধে যোগ দেবে বলে সিদ্ধান্ত হলো। ছোবানকে বলা হলো টর্চ নিয়ে সুচক্রদন্ডী খালের পাড়ে থাকতে। ঐদিনই শামসুদ্দিন আহমদ চৌধুরী মাহাবুবকে নিয়ে গৈড়লায় কমরেড অনিল লালার বাড়িতে উপস্থিত হন। অনিল লালার বোনের বাড়িতে দুপুরের খাবার শেষে নন্দীর ঘাট থেকে নৌকা নিয়ে বরকল শাহজাহান ইসলামাবাদীর বাড়িতে যান এবং সেখানে মুজিব বাহিনীর নেতা এস এম ইউসুফের ছোটভাই নাসিরের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে। শাহজাহান ইসলামাবাদীর বাড়ি থেকে একটি কাঠের বাঁটের বৃটিশ স্টেনগান, ৫টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও কিছু গুলি নেয়ার পর শামসুদ্দিন, নাসির এবং তাকে কানাইমাদারীর হাবিলদার আবু, ফেরদাউস ইসলাম খান নৌকায় উঠিয়ে দেন। ইন্দ্রপুল ব্রীজ অতিক্রম করার প্রাক্কালে রাজাকাররা নৌকায় কারা এবং কোথায় যাচ্ছে জানতে চায়। যাত্রার পূর্বেই নাসিরকে টুপি পরিয়ে নৌকার উপরে বসানো হয়েছিল। তখন নাসির জবাব দিল, খানমোহনায় আত্মীয় চেয়ারম্যান আহমদ ছফা চৌধুরীর বাড়িতে যাচ্ছে। টর্চ লাইটসহ বাড়ির ছোবান সুচক্রদন্ডী খালের পাড়ে বসে থাকার কথা ছিল, জোয়ার ভাটার বিলম্বের কারণে তিনি চলে গিয়েছিলেন। তারা খানমোহনার চেয়ারম্যান আহমদ ছফার বাড়ির পিছন দিক দিয়ে উঠেন। চৌধুরী মাহাবুব তাঁর বাবার নানার বাড়ি সাহিত্য বিশারদ এর বাড়ি মনে করে ছাত্র ইউনিয়নের আবসার উদ্দিন আহমেদ তোতার (মুক্তিযোদ্ধা) বোন ছেনু আপার নাম ধরে ডাকাডাকি শুরু করেন এবং মঞ্জুর জেঠাতো ভাই বলে পরিচয় দেন। ততক্ষণে ঘরের জানালা বন্ধ হয়ে যায়, লাইট নিভে যায়। বাড়ির সামনে এসে আহমদ ছফা চেয়ারম্যানের বাড়ি সনাক্ত হলো। শামসুদ্দিন আহমদ তাঁকে কোন জায়গায় পরিচয় না দেওয়ার কথা বললেন। তিনি তাদের একশত টাকা চা খাওয়ার জন্য দিয়েছিলেন। অতঃপর সুচক্রদন্ডীর পাশ দিয়ে নোয়াবাড়ী হয়ে চৌধুরী মাহাবুবের বাড়িতে এসে ছোবান, ছফা, জহির সালামকে নিয়ে সাতগাছিয়া দরবার শরীফে রওনা হন। পথিমধ্যে ইছহাক মাকরানি তার পিতাকে নিয়ে তরমুজ ক্ষেতে অবস্থান করছিলেন। ইছহাককে বলা হলো পরের দিন দরবারে আসতে। দরবার শরীফে উঠার পর শামসুদ্দিন আহমদ মোস্তাক বিল্লাহর সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি তাকে মামা ডাকার জন্য বলেন। রাতে মাদ্রাসার ছাত্রদের খাবার থেকে তারাও খান। পরদিন হাজির মাঠে তাদের ক্যাম্পে কালাম, কবির, সবুর উপস্থিত হন। স্থানীয় ভাবে প্রশিক্ষণের জন্য একটা অস্থায়ী ক্যাম্প খোলা হয়।
খানমোহনা স্টেশন আক্রমণে চৌধুরী মাহাবুব
এসময় সুবেদার মেজর টিএম আলীর গ্রুপ, শামসুদ্দিনের গ্রুপ—এই ২টি গ্রুপ আলোচনা করে একটি যৌথ অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নেন। চৌধুরী মাহাবুব তখন শামসুদ্দিন গ্রুপের অন্যতম নীতিনির্ধারক। দুটি স্থানে ২ গ্রুপের যৌথ অপারেশনের পরিকল্পনা করা হয়। দুটি স্থানের একটি হল খানমোহনা রেল স্টেশন রাজাকার ক্যাম্প এবং অপরটি ডেঙ্গাপাড়া কাদের স্কুল রাজাকার ক্যাম্প। তারা দুইগ্রুপে বিভক্ত হয়ে আক্রমণের কৌশল নির্ধারণ করেন। একগ্রুপ সোবহানের গাইডেন্সে খানমোহনা রেলষ্টেশন, অন্য গ্রুপ শাহ আলম এর গাইডেন্সে খরনার রেল ষ্টেশনে যান। খানমোহনা রেলষ্টেশন রাজাকার ক্যাম্প ও ডেঙ্গাপাড়া কাদের স্কুল রাজাকার ক্যাম্প অপারেশনের জন্য শামসুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে (দলনেতা), চৌধুরী মাহাবুব, সবুর, কালাম, কবির, ছফা, নাসির, ইছহাক ঘটনাস্থলে পৌঁছান। টি.এম আলী গ্রুপ খানমোহনা রেল ষ্টেশনটি রাজাকাররা বুঝতে না পারে মত ঘিরে রাখেন। পটিয়া থেকে খান মোহনা রেল স্টেশনে প্রবেশের মুখে এল.এম.জি নিয়ে সেনাবাহিনীর একজন লোক অবস্থানে ছিলেন। তারা স্কুলে পৌঁছে ফায়ার আরম্ভ করার সাথে সাথে ষ্টেশনের গ্রুপ ফায়ার আরম্ভ করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। চৌধুরী মাহবুব, সবুর, কবির, কালামকে রেল লাইনের পশ্চিম পুকুর পাড়ে কাদের স্কুল মুখী পজিশনে রেখে শামসুদ্দিন আহমদ ছোবানকে নিয়ে স্কুলের উদ্দেশ্যে চলে যান। কথা ছিল তিনি গ্রেনেড ছুঁড়ে ষ্টেনগান থেকে ১টি রিপিট ফায়ার দেওয়ার পর তারা ফায়ার শুরু করবেন। কিছুক্ষণ পর শামসুদ্দিন আহমদ এসে চৌধুরী মাহাবুবকে বকা শুরু করলেন। কারণ হাবিলদার সুজা এবং হাবিলদার ফজলুসহ চৌধুরী মাহাবুব রেকি করার সময় যার থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন সে রাজাকারদের ভাগিয়ে দেয়। উল্লেখ্য, রেকি করার সময় চৌধুরী মাহাবুব দক্ষিণ ভূর্ষি স্কুলের ডেঙ্গাপাড়াস্থ এক ছাত্রকে সেখানে ‘কয়জন রাজাকার থাকে’ তা জিজ্ঞেস করেছিলেন। পজিশন উইথড্র করে রেললাইন ক্রস করবেন এমন সময় দেখেন এক সেনা সদস্য যার কাছে এল.এম.জি. ছিলো, তিনি স্কুলমুখী হয়ে পজিশনে রয়েছেন অথচ তাকে ধলঘাট স্টেশনমুখী হয়ে পজিশন নিয়ে থাকতে বলা হয়েছিলো। পাঞ্জাবিদের টহলের গাড়ি এলে তিনি যেন প্রতিরোধ করতে পারেন। সবুর তাকে থাপ্পর মেরে দেন। কেন না সৈনিকটি ফায়ার আরম্ভ করলে মুক্তিযোদ্ধারাই প্রথমে মারা যেতেন। খানমোহনা ষ্টেশনের মাহমুদ মিয়ার বাড়ির পিছনে এসে শামসুদ্দিন আহমদ তার পিছনে চৌধুরী মাহাবুব এবং তার পিছনে ইছহাক ক্রলিং করে ষ্টেশনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ ইছহাক ফায়ার করে দেন যা তাদের দুজনের কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। শামসুদ্দিন আহমদ ইছহাককে গালিগালাজ করতে লাগলেন।
অবশ্য ইছহাক গালি খেয়েও জানায় জীবনের প্রথম অপারেশনে এসে খুশি হয়ে গুলি করেছে। কিছুক্ষণ ফায়ার করার পর তারা ষ্টেশনে গিয়ে দেখেন তিনজন রাজাকার মরে রয়েছে। সেখান থেকে দুইটা রাইফেল পাওয়া যায় এবং বাকি রাজাকাররা পালিয়ে যায়। ফিরে আসার প্রাক্কালে হাবিলদার সুজা তার লোককে মারার কারণ জানতে চাইলেন। তারা ভুলবোঝাবুঝি হয়েছে বলে জানান। দুই তিনজন সেনাসদস্যের মাঝে একজন করে ছাত্র হাটা আরম্ভ করে হাজির মাঠে এসে শুনলেন খরনাতে শাহ আলম গুলিবিদ্ধ হয়ে এসেছেন। সকালে চৌধুরী মাহাবুব আর ছোবাহান ডাক্তারের জন্য পটিয়া গিয়েছিলেন। ডাক্তার জহুর এবং ডাক্তার হাশেম দু’জনের সাথে যোগাযোগের পর তারা জানালেন যে, পাহাড়ে গিয়ে অপারেশন করার সরঞ্জাম তাদের কাছে নাই। যাওয়ার পর চেম্বারে ফিরে আসার সাথে সাথে পাঞ্জাবিরা তাদের মেরে ফেলবে এজন্য তারা আর হাজির মাঠে যাননি। শাহ আলম মারা গেলেন এবং তাকে হাজির মাঠে দাফন করা হলো। উল্লেখ্য যে, খানমোহনা এবং খরনা রেলষ্টেশনে পূর্বে ও পরবর্তীকালে আর কোন অপারেশন হয়নি। টিএম আলী গ্রুপ কমলাছড়ি চলে গেলেন আর তারা দক্ষিণ ভূর্ষি অপূর্ব চৌধুরীর বাড়িতে অবস্থান নেন।
গাজী আবদুস সবুর যেভাবে শাহাদাত বরণ করেন
২ অক্টোবর চৌধুরী মাহাবুব আর নাসির বরকল থেকে এমুনিশন নিয়ে আসার পর, শাসসুদ্দিন আহমদ, সবুর, ছফা ও জহিরসহ নাসিরের থলেতে করে ষ্টেনশগান নিয়ে ভট্টাচার্য্য হাটে রওনা হন। দালাল মুন্না হেটে আসছে দেখে শাসুদ্দিন আহমদ সবুরকে বললেন মুন্নাকে পিছন থেকে ধরতে। সবুর ধরার সাথে সাথে নাসির এর কাছ থেকে শামসুদ্দিন আহমদ ষ্টেনগান নিয়ে মুন্নাকে হাঁটার কথা বলার সাথে সাথে ট্রিগারে চাপ পড়ে ষ্টেনগান থেকে সব বুলেট বেরিয়ে মুন্নার বুক ভেদ করে ছয়টি গুলি সবুরের বুকে গিয়ে লাগে। তৎক্ষণাৎ সবুরকে হাটের পাশে একটি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে লজ্জাবতী গাছের উপর শুইয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় একজন হাতুড়ে ডাক্তার কাঁচের বোতলের ভাঙ্গা কাঁচ দিয়ে ক্ষত সেলাই করছিলেন। চৌধুরী মাহাবুব একা দাঁড়িয়ে সেই বেদনাদায়ক দৃশ্য অবলোকন করেন। শামসুদ্দিন আহমদ শোকে বিহ্বল ছিলেন। সবুর তাঁর মাকে দেখতে চেয়েছিলেন শেষবার। কিন্তু থানা হেড কোয়ার্টারে কারফিউ জারি থাকায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সবুর বলেছিলেন, ‘আমি মরে গেলেও দেশ স্বাধীন হবে, তোরা বেইমানি করিস না’। এই কথা বলে সবুর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চৌধুরী মাহাবুব আহমদ ছফাকে বুলেটবিহীন স্টেনগানটা দিয়ে পাহারায় রাখেন। জহির, নাসিরকে দিয়ে শেল্টার থেকে অস্ত্রগুলি ও ভূরিপাড়া পাঞ্জেগানা মসজিদ থেকে লাশ বহনের ছোট স্ট্রেচারটা আনিয়ে সবুরকে কেলিশহর ফরেষ্ট অফিসে নিয়ে যান। কয়েকদিন আগে চৌধুরী মাহাবুব আর সবুর কর্তৃক শামসুদ্দিন আহমদের বাপের থেকে আনা লুঙ্গি দিয়ে সবুরের দাফনের কাজ সম্পন্ন করা হয়। ভট্টাচার্য হাটে বাজার করতে এসে তাদের বাড়ির জাফর তাদের অনুরোধে সবুরের দাফন কার্যে সহায়তা করতে কেলিশহর ফরেষ্ট অফিসে এসেছিলেন। তিনি বাজারের থলেটা তাদের বাড়ির মিয়াদা’কে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। দাফন শেষে তিনি চৌধুরী মাহাবুব ও জহিরকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেন। শামসুদ্দিন আহমদ বারণ করলে জাফর বলেন, ‘চৌধুরী মাহাবুব, তোমার আর জহুর এর কারণে আমি এসেছি, আমাকে পাঠাবার ব্যবস্থা কর’। পরে শামসুদ্দিন থেকে অনুমতি পাওয়ার পর ছফা ও তাদের দেখতে আসা স্থানীয় করিম কিছু পথ এগিয়ে দিয়ে আসেন। তারা কেলিশহর ব্যাংকের কিছুদুরে থাকতে শোরগোল শুনতে পান। বুঝে যান রাজাকাররা পাহাড় থেকে নামার পথে তাদেরকে মেরে ফেলার জন্য বসে রয়েছে। তারা উক্ত স্থান হতে ক্রলিং করে রতনের দীঘির পাশ দিয়ে উঠেন।
বাড়ি গিয়ে দেখেন সবাই উদ্বিগ্ন। চৌধুরী মাহাবুবের জেঠা মুক্তিবাহিনীতে যাওয়ার জন্য তাকে গালিগালাজ করেন, তাঁর পিতা নিরব ছিলেন, চাচা মালেক চৌধুরী বলেন, ‘তোর কারণে সবাই মারা যাব’; ছোট চাচা খালেক চৌধুরী বলেন তার যেখানে খুশি সেখানে যাবে কেউ কিছু বলবেন না। ভাত খেয়ে চৌধুরী মাহবুব আর জহুর আমির ভান্ডারের শাহজাদা মৌলানা হারুন অর রশিদ আমীরের তত্ত্বাবধানে রাত কাটিয়ে ভোরে কেলিশহর ফরেষ্ট অফিসে চলে যান। তাদের এগিয়ে দিতে আসা করিম একটি দুর্ঘটনা ঘটান যা পরেরদিন ফরেষ্ট অফিসে গিয়ে স্থানীয় বিচার চাওয়া লোকদের থেকে জানা যায়, স্থানীয় লোকেরা তাদের সাথে যোগাযোগ করতে আরম্ভ করলেন। রশীদ মেম্বার, গনি কাইতং, আহমদ ছফা, আফিয়ার বাপ সকলেই সবুরের ফতেহার জন্য একটি ছাগলের ব্যবস্থা করেন। রান্নার সময় দুর্গাবাবু সম্মুখে একটা মুক্তিযোদ্ধার গ্রুপ এসেছে, তারা তাদের সাথে যোগাযোগ করতে চান বলে শামসুদ্দিনকে ডেকে নিয়ে যান। সন্ধ্যার সময় কিছু লোককে খাবার দেয়া হয়েছে। চৌধুরী মাহাবুব স্টেনগান নিয়ে সেন্ট্রি ডিউটিতে। কয়েকজন লোক উপরে আসছে দেখে হল্ট বলার সাথে সাথে ‘সামশুদ্দিন ফ্রেন্ড’ জবাব দিয়ে আরো কয়েকজন অচেনা লোক নিয়ে উপরে উঠে আসলেন। তাদেরকে অস্ত্রগুলো দিয়ে দেওয়ার জন্য বললেন। অর্থাৎ ক্যাপ্টেন করিম সবুর মারা যাওয়ার কারণে তাদের অস্ত্রগুলো নিয়ে নিলেন। সামশুদ্দিন ছফা ও সালামকে নিয়ে ভারতের ডিমাগিরিতে চলে যান। ডিমাগিরিতে ট্রেনিং সেন্টার না থাকাতে সকলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ফিরে আসেন।
চৌধুরী মাহাবুব পুনরায় বরকল যাওয়ার পথে মোহাম্মদপুরে তাঁর এস এম আবুল কাসেমের দেখা পান। তিনি এবং দক্ষিণ ভূর্ষি স্কুল শিক্ষক এডভোকেট মোহাম্মদ আলীর ভাই ইউসুফ চৌধুরী ( প্রকৌশলী, বর্তমানে আমেরিকার বস্টন অঙ্গরাজ্যে সপরিবারে বসবাস করেন) রাতে একটা অপারেশনে যাওয়ার জন্য বললে স্থানীয় হাজির পাড়ার কয়েকজন লোক রাতের অন্ধকারে হিন্দুদের বাড়িতে এসে নির্যাতন করে বলে জানালে চৌধুরী মাহাবুব ও ইউসুফ একটি পিস্তল ও একটি হ্যান্ড গ্রেনেড নিয়ে জোয়ারার জনৈক হিন্দু এডভোকেটের বাড়িতে মুরগীর ঘরে অবস্থান নিয়েছিলেন। তখন হাজিপাড়ার লোকেরা জোয়ারায় অবস্থানরত হিন্দুদের দাঁড়ি রাখা, গরুর মাংস খাওয়ানো এবং টিন দিয়ে মসজিদ তৈরি করে দিয়েছিলেন। রাতে উক্ত স্থানে কাউকে না পাওয়াতে ইউসুফ শহরে চলে যান। চৌধুরী মাহাবুব বাড়িতে চলে আসেন। ইতিমধ্যে হাইদগাঁওর আবু সৈয়দ (পরবর্তীকালে এডভোকেট) গ্রুপ নিয়ে ভারত থেকে কেলিশহর ছায়া বিশ্বাসের বাড়িতে পৌছেন। তিনি চৌধুরী মাহাবুবকে ডেকে পাঠিয়ে তার গ্রুপে ৩নং সেকশনের এসিস্ট্যান্ট কমান্ডার এর দায়িত্ব দেন। সাথে ছিল চাচাতো ভাই জহুর। থানা মুক্ত করার প্রাক্কালে শাহ আলম গ্রুপের অস্ত্রবিহীন একজন মুক্তিযোদ্ধা চট্টগ্রাম বন্দরের শেখ মানিককের সাথে তাদের ভুল বুঝাবুঝির কারণে পটিয়া থানায় বেঁধে রাখা হয়। বাঁধন হালকা থাকার কারণে সে নিজেকে মুক্ত করে চলে যেতে সক্ষম হয়। ইন্দ্রপোল ব্রিজ ও অন্যান্য জায়গায় মহসিন গ্রুপ ও আবু সৈয়দ গ্রুপকে নিয়ে তাঁরা অবরোধ সৃষ্টি করে ইন্দ্রপোল জ্বালিয়ে দেয়। ১৩ ডিসেম্বর পাঞ্জাবিরা সিএন্ডবি অফিস হতে সরঞ্জামাদি নিয়ে ইমারজেন্সী লোহার ব্রীজ স্থাপন করে শহরে পালিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে ইন্দ্রপুলে আগুন ধরিয়ে দিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং মানুষ মারে। তার পাশে থাকা শাহজাহান ইসলামাবাদী গ্রুপের বরকলের আহমদুর রহমান এল এম জিটা ফেলে দেন। কিছুক্ষণ পর সড়ক পথে এবং ট্রেন যোগে পাঞ্জাবিয়া পটিয়া হেডকোয়াটারের পুনরায় দখল নিয়ে কক্সবাজার দোহাজারী হতে এসে শহরে চলে যান।
পটিয়া থানায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন
ঐদিন ১৩ ডিসেম্বর ১১ টা ১৫ মিনিটের সময় কমান্ডার মহসিন খান, কমান্ডার আবু সৈয়দের নেতৃত্বে তারা মুক্ত পটিয়ায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। দুপুরে সাহিত্য বিশারদের ভাতিজা চট্টগ্রাম বন্দরের অফিসার শামসুল আলমের ঘরে (চৌধুরী মাহাবুবের বাবার মামাতো ভাই) খেয়ে ভাটার সময় বরকলের হাবিব, আহমুদুর রহমানসহ এল এম জিটা উদ্ধার করে হাইদগাঁও তীরার দীঘির হাটে চলে যান। সকালে আবুলসহ অনেক রাজাকারকে তারা আবু সৈয়দ, বরকলের হাবিব ও অন্যদের সহায়তায় হাইদগাঁও পানবরজ সংলগ্ন স্কুলে বন্দি করেন এবং পটিয়া থানার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। শেষে তারা সবাই পটিয়া জমিরিয়া মাদ্রাসায় অবস্থান করেন। ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ক্যাপ্টেন পি.কে মল্লিক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শাহ আলম ও প্লাটুন কমান্ডার সিরাজুল ইসলামকে আর্মি অস্ত্র উদ্ধারের জন্য বেঁধে নিয়ে আসে। মুক্তিযোদ্ধাদের সমস্ত অস্ত্র সকালে ট্রাম কারে করে চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে যাওয়া হয়।