জিল্লুর রহমান
২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বর্তমানে এক অভূতপূর্ব ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সুনির্দিষ্ট কৌশল ও প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলেও, পরবর্তী সময়ে দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, ‘মব জাস্টিস’, সহিংসতা এবং প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতি গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে।
শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি জনগণের বিপুল প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দৃশ্যমান হচ্ছে না। প্রশাসনিক অনভিজ্ঞতা, নিত্যপণ্যের উর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির শিথিলতা এবং নতুন মোড়কে ব্যাপক চাঁদাবাজির উত্থান দেশের অর্থনীতিকে চরম স্থবিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একইসঙ্গে জ্বালানি (তেল ও গ্যাস), বিদ্যুৎ এবং কৃষির প্রধান নিয়ামক সারের তীব্র সংকট উৎপাদন খাতকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
রাজনৈতিক নানা বিতর্কের পাশাপাশি বিগত সরকারের আমলের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকটি অস্বীকার করার উপায় নেই। শেখ হাসিনার মেয়াদে বাস্তবায়িত মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা সেতু, গভীর সমুদ্রবন্দর ও আধুনিক মহাসড়কের মতো মেগা প্রকল্পগুলো দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি এনে দিয়েছিল। কিন্তু এর সমান্তরালে গোটা ৫-১০ জনের এক অতি-প্রভাবশালী গোষ্ঠী ব্যাংক খাতকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছে এবং প্রায় ১০ হাজার ব্যবসায়ী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, যা অর্থনীতির মজবুত ভিত্তিটিকে নড়বড়ে করে দেয়।
তবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিক বিচারে, কোনো সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তির অপরাধের দায় একটি গোটা রাজনৈতিক দলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। আওয়ামী লীগ রাতারাতি গড়ে ওঠা কোনো দল নয়; এটি দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও অধিকার আদায়ের চেতনা থেকে গড়ে ওঠা দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল, যার মূল শক্তি প্রান্তিক কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ। ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত দলগুলোর সাথে ঐতিহ্যবাহী এই আন্দোলনের শক্তির তুলনা টানা রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিকভাবে অসংগত।
একটি বৃহৎ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীকে কোণঠাসা করার ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে আজ এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে। দেশের একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক মূলধারায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারছে না। ফলে কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে, যুবসমাজ বেকার হয়ে পড়ছে এবং নতুন বিদেশি ও দেশি বিনিয়োগ একপ্রকার থমকে গেছে।
সংকটের রূপরেখা ও উত্তরণের উপায়
বর্তমান স্থবিরতা থেকে বের হয়ে এসে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল এবং রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল করতে হলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি:
১. রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি: রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ওপর তৈরি হওয়া নিষেধাজ্ঞা বা আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর করে তাদের অনুসারী ও সমর্থকদের দেশের মূলধারার অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত।
২. ব্যক্তিপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা: যারা প্রকৃত অপরাধী, ব্যাংক খাতের লুটেরা বা অর্থপাচারকারী—তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দেশ ও বিদেশের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দলগতভাবে একটি ঐতিহ্যবাহী সংগঠনকে ঢালাওভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা অনুচিত।
৩. বিনিয়োগবান্ধব রাজনৈতিক পরিবেশ: স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে না পারলে দেশীয় ব্যবসায়ীদের স্থবিরতা কাটবে না এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও নিরাপদ বোধ করবেন না।
৪. জরুরি সেবা ও উৎপাদন খাত সচল করা: শিল্প উৎপাদন ও কৃষির স্বার্থে অবিলম্বে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং সারের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে এবং নতুন রূপের চাঁদাবাজি শক্ত হাতে দমন করতে হবে।
রাজনৈতিক প্রতিশোধের মেকানিজম বন্ধ করে বিচারিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং একটি সমন্বিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করাই এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে সংকটমুক্ত করার একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।লেখক: জিল্লুর রহমান সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স এনালিস্