1. editor@purbobabgla.net : Web Editor : Web Editor
  2. admin@purbobangla.net : purbabangla :
  3. jashad1989@gmail.com : Web Editor : Web Editor
মিনারেল ওয়াটারের জারের পানি কি সত্যিই বিশুদ্ধ? - পূর্ব বাংলা
বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন

মিনারেল ওয়াটারের জারের পানি কি সত্যিই বিশুদ্ধ?

পূর্ব বাংলা ডেস্ক
  • প্রকাশিত সময়ঃ শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬
  • ৭১ বার পড়া হয়েছে

 

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ

শহরের প্রতিটি অলিগলি, বাসা-বাড়ি, অফিস, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল—সবখানেই আজ এক অপরিহার্য বস্তু: মিনারেল ওয়াটারের নীল জার। তিনতলা বাড়ির ছাদে যেমন এর দেখা মেলে, তেমনি ফুটপাথের চায়ের দোকানেও। নগরজীবনের পানির সংকট, নলকূপের আস্থাহীনতা আর ওয়াসার লাইনের অনিশ্চয়তা—এই তিনের ফাঁকে গড়ে উঠেছে এক বিশাল ব্যবসা: “বিশুদ্ধ পানির” ব্যবসা। প্রশ্ন হলো, এই জারের পানিই কি সত্যিকার অর্থে বিশুদ্ধ? নাকি এটি কেবল আমাদের সম্মিলিত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রম?

“১০০% বিশুদ্ধ”, “আধুনিক প্রযুক্তিতে পরিশোধিত”, “নিরাপদ পানীয়”—এই শব্দগুলো এখন জারের গায়ে ছাপা এক ধরনের অলংকার। কিন্তু বিশুদ্ধতা কোনো শব্দ নয়, এটি একটি বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড। বিশুদ্ধ পানির অর্থ শুধু স্বচ্ছ ও গন্ধহীন হওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ভারী ধাতু, রাসায়নিক দূষণ, এমনকি পানির পিএইচ ও খনিজ উপাদানের ভারসাম্য।
সমস্যা হলো, ভোক্তার বড় অংশ এই জটিল বাস্তবতা জানেন না। তারা ধরে নেন—নল থেকে নয়, জার থেকে এলে পানি নিরাপদই হবে। এই ধারণার সুযোগ নিয়েই বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে অসংখ্য ব্র্যান্ড, যাদের বড় অংশের কোনো দৃশ্যমান জবাবদিহি নেই।

কাগজে-কলমে মিনারেল বা ড্রিংকিং ওয়াটার উৎপাদনের জন্য লাইসেন্স প্রয়োজন। বিএসটিআই, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর—এত সংস্থার অনুমতির কথা বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে লাইসেন্স থাকলেই কি নিয়ম মানা হয়? প্রশ্নটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক কারখানায় একবার অনুমোদন পাওয়ার পর বছরের পর বছর আর কোনো কার্যকর পরিদর্শন হয় না। ফিল্টার কখন বদলানো হচ্ছে, ইউভি লাইট কার্যকর আছে কি না, পানির উৎস বদলানো হয়েছে কি না—এসব দেখার লোক কার্যত নেই। ফলে “অনুমোদিত” জারও যে নিরাপদ, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

মিনারেল ওয়াটার নাম হলেও বাস্তবে অধিকাংশ জারের পানিই আসে ভূগর্ভস্থ পানির উৎস থেকে। সেই পানি প্রথমে উত্তোলন করা হয়, পরে ফিল্টার করে বোতল বা জারে ভরা হয়। কিন্তু সেই ভূগর্ভস্থ পানি যদি আর্সেনিক, লোহা বা অন্যান্য ভারী ধাতুতে দূষিত হয়, তাহলে শুধু সাধারণ ফিল্টার দিয়ে তা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়।
আরও ভয়াবহ হলো—কিছু অসাধু উৎপাদক সরাসরি ওয়াসার পানি ব্যবহার করেন। সেই পানি সামান্য ছেঁকে, কখনো কখনো কেবল গন্ধ দূর করে, বাজারে ছাড়েন “বিশুদ্ধ” নাম দিয়ে। ভোক্তার পক্ষে বোঝার কোনো উপায় থাকে না।

জারের বাইরের নীল রঙ আর ভেতরের স্বচ্ছ পানি দেখে আমরা নিশ্চিন্ত হই। কিন্তু সেই জারের ভেতরে কী ঘটছে, তা আমরা খুব কমই ভাবি। বহুবার ব্যবহৃত এই প্লাস্টিক জার যদি ঠিকমতো পরিষ্কার না করা হয়, তাহলে তা নিজেই হয়ে উঠতে পারে জীবাণুর আঁতুড়ঘর।
অনেক ক্ষেত্রে জার ধোয়া হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, নিম্নমানের ডিটারজেন্ট বা রাসায়নিক দিয়ে। সেই রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ পানিতে মিশে যেতে পারে। আবার ঠিকমতো শুকানো না হলে আর্দ্র পরিবেশে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে যে পানি আমরা স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য পান করছি, সেটিই ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি তৈরি করে “মিনারেল” শব্দটি। প্রকৃত মিনারেল ওয়াটারে নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রাকৃতিক খনিজ উপাদান থাকার কথা। কিন্তু আমাদের বাজারের অধিকাংশ জার আদতে “ড্রিংকিং ওয়াটার” খনিজ উপাদান প্রায় সম্পূর্ণ অপসারিত, পরে কৃত্রিমভাবে কিছু যোগ করা হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে তাও করা হয় না।
এর ফলে দীর্ঘদিন এমন পানি পান করলে শরীরে প্রয়োজনীয় কিছু খনিজের ঘাটতি তৈরি হতে পারে এমন আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। অথচ বিজ্ঞাপনে এই দিকটি নিয়ে কোনো আলোচনা নেই।

দূষিত পানির প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে ধরা পড়ে না। পেটব্যথা, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস এসব রোগ ধীরে ধীরে ছড়ায়। অনেক সময় রোগী নিজেও জানেন না, সমস্যার উৎস তার প্রতিদিনের পানীয় জল।
শিশু, বৃদ্ধ ও রোগপ্রবণ মানুষদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি। অথচ সবচেয়ে বেশি মিনারেল ওয়াটার ব্যবহৃত হয় হাসপাতালেই—যেখানে রোগ প্রতিরোধের বদলে যদি রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে, তা হলে সেটি নিছক অব্যবস্থাপনা নয়, একটি গুরুতর সামাজিক ব্যর্থতা।

এই পুরো ব্যবস্থায় সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ ভোক্তা। তিনি না পারেন পানি পরীক্ষা করতে, না পারেন কারখানা পরিদর্শন করতে। তার ভরসা কেবল ব্র্যান্ডের নাম আর জারের গায়ে ছাপা কিছু শব্দ। অভিযোগ করার পথও সহজ নয়। কোথায় অভিযোগ করবেন, কীভাবে করবেন এসব জানার আগেই ভোক্তা অন্য ব্র্যান্ডে চলে যান। সমস্যার মূলে আঘাত পড়ে না।

পানি মৌলিক অধিকার। নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু যখন সেই দায়িত্ব বেসরকারি বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন শক্ত নজরদারি অপরিহার্য। নিয়মিত ল্যাব টেস্ট, আকস্মিক পরিদর্শন, ভেজাল প্রমাণ হলে কঠোর শাস্তি এসব ছাড়া এই খাত নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।
দুঃখজনকভাবে, আমাদের এখানে আইন আছে, প্রয়োগ নেই। নীতিমালা আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন নেই। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা বারবার পার পেয়ে যায়।

সমাধান একক নয়।
প্রথমত, সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ভোক্তাদের সচেতন হতে হবে—একই জার দীর্ঘদিন ব্যবহার না করা, জারের ভেতরে ময়লা বা শ্যাওলা দেখলে তা বাতিল করা, সন্দেহ হলে অভিযোগ করা।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে টেকসই সমাধান হলো সরকারি পানির সরবরাহ ব্যবস্থাকে এমন মানে উন্নীত করা, যাতে মানুষ বাধ্য হয়ে জারের পানির ওপর নির্ভর না করে।

মিনারেল ওয়াটারের জারের পানি কি বিশুদ্ধ? উত্তর এককথায় দেওয়া যায় না। কিছু ক্ষেত্রে হয়তো বিশুদ্ধ, অনেক ক্ষেত্রে নয়। কিন্তু যে ব্যবস্থায় বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করার দায় সবার, অথচ জবাবদিহি কারও নেই সেই ব্যবস্থায় নিশ্চিন্ত থাকা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়।
স্বচ্ছ জার মানেই স্বচ্ছ সত্য নয়। আর পানির মতো মৌলিক বিষয়ের ক্ষেত্রে এই সত্যটা যত দেরিতে বুঝব, তার মূল্য তত বেশি দিতে হবে স্বাস্থ্য দিয়ে, আস্থার বিনিময়ে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঝুঁকি বাড়িয়ে।

শেয়ার করুন-
এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2021 purbobangla