নিজস্ব প্রতিনিধি
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ও বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিস ঘিরে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে ‘কন্ট্রাক্টে’ পাসপোর্ট করে দেওয়ার অভিযোগের ধারাবাহিকতায় নতুন করে অনুসন্ধানে একই ধরনের অভিযোগের তথ্য পেয়েছে পূর্ব বাংলা।
এর আগে পাঁচলাইশ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ঘিরে কথিত দালালদের অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া এবং ‘কন্ট্রাক্টে’ পাসপোর্ট করে দেওয়ার আশ্বাসের অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল পূর্ব বাংলা। এবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের সামনে সরেজমিন অনুসন্ধানেও সরকারি নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে পাসপোর্ট করে দেওয়ার প্রস্তাব পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানের সময় সাধারণ সেবাপ্রার্থী সেজে অফিসের সামনে অবস্থান করলে কয়েকজন ব্যক্তি প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদের কয়েকজন অফিসের আশপাশের কম্পিউটার দোকান ও পাসপোর্ট ফি জমা দেওয়ার বুথের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচয় দেন।
প্রতিবেদক কক্সবাজার জেলার বাসিন্দা এবং বর্তমানে চট্টগ্রামে ভাড়া বাসায় থাকা এক নারীর পাসপোর্ট করার বিষয়ে জানতে চাইলে কয়েকজন অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে কাজটি করে দেওয়ার আশ্বাস দেন বলে দাবি প্রতিবেদকের।
তাদের একজন সরকারি নির্ধারিত ফিসহ প্রায় ১০ হাজার টাকা দিলে পাসপোর্ট করে দেওয়ার কথা জানান বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে।
একইভাবে অফিসের সামনের একটি কম্পিউটার দোকানে বসা সায়েম নামের এক ব্যক্তি কক্সবাজারের জাতীয় পরিচয়পত্রধারী একজন ব্যক্তির চট্টগ্রাম থেকে পাসপোর্ট করার ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলেন বলে দাবি প্রতিবেদকের।
সায়েমের দাবি, পাসপোর্ট অফিসে তার পরিচিত কর্মকর্তা রয়েছেন এবং তাদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাজ সহজে সম্পন্ন করা সম্ভব। এমনকি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঝামেলাও কম হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন বলে প্রতিবেদকের দাবি। এ সময় তিনি যোগাযোগের জন্য একটি মোবাইল নম্বরও দেন।
তবে সায়েমের সঙ্গে পাসপোর্ট অফিসের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি পূর্ববাংলা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা প্রয়োজন।
ওই কম্পিউটার দোকানে থাকা হাটহাজারীর চৌধুরীহাট এলাকার এক সেবা প্রত্যাশীর সঙ্গেও কথা বলেন প্রতিবেদক। তিনি দাবি করেন, ওই দোকানের মাধ্যমে তিনি নিজে, তার স্ত্রী ও ছেলের পাসপোর্ট করেছেন। এজন্য প্রত্যেকের ক্ষেত্রে প্রায় ১০ হাজার টাকা করে দিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, এভাবে কাজ করায় তাকে সরাসরি অফিসিয়াল প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হয়নি।
এছাড়া এমরাইজ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি কম্পিউটার দোকানেও অনুসন্ধান চালানো হয়। সেখানে কক্সবাজার জেলার একজন বাসিন্দার পাসপোর্ট চট্টগ্রাম থেকে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে বলে দাবি প্রতিবেদকের।
এমনকি অফিসের ভেতরে কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে দ্রুত ফরম পূরণ, টাকা জমা এবং পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেওয়ার আশ্বাসও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এ সময় যোগাযোগের জন্য দোকানের একটি ভিজিটিং কার্ডও দেওয়া হয় ।
অফিসের আশপাশে থাকা বিসমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজ, আলিফলাম মিম এন্টারপ্রাইজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও একই ধরনের প্রস্তাবও পাওয়া যায়।
অনুসন্ধানে সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে ‘কন্ট্রাক্টে’ পাসপোর্ট করে দেওয়ার দাবি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে উঠে এসেছে।
তবে অনুসন্ধানে পাওয়া এসব ব্যক্তির বক্তব্যের সত্যতা এবং পাসপোর্ট অফিসের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে তাদের বক্তব্যকে অভিযোগ ও দাবি হিসেবেই দেখছে পূর্ব বাংলা।
পরিচালকের নজরদারি ও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালকের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বললে তিনি জানান, তিনি সেপ্টেম্বর মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সবকিছুতে একসঙ্গে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিষয়গুলোতে তিনি নজরদারি রাখছেন।
তিনি জানান, কোনো সেবাপ্রার্থী হয়রানি বা অনিয়মের শিকার হলে সরাসরি তার কাছে অভিযোগ করতে পারবেন। অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাসম্ভব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সেবাপ্রার্থীদের সচেতন করতে মতবিনিময় সভা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি অডিও বার্তার মাধ্যমে দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে হয়রানির শিকার না হয়ে সরাসরি অফিসিয়াল প্রক্রিয়ায় পাসপোর্ট সেবা নেওয়ার জন্য সেবাপ্রার্থীদের আহ্বান জানানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
পরিচালক বলেন, সেবাপ্রার্থীদের অফিসিয়াল নিয়ম মেনে সরাসরি সেবা নিতে হবে। কেউ অফিসিয়াল প্রক্রিয়ায় না এসে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে প্রতারণার শিকার হলে পরবর্তীতে সমস্যার সমাধান করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অফিসের আশপাশে কথিত দালালদের তৎপরতা বন্ধে পুলিশকে চিঠি দেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন তিনি। পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে যাতে কোনো মধ্যস্থতাকারী বা দালালের তৎপরতা না থাকে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।একদিকে নতুন বিভাগীয় পরিচালক নজরদারি ও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে ‘কন্ট্রাক্টে’ পাসপোর্ট করে দেওয়ার প্রস্তাব পাওয়ার অভিযোগ উঠছে।
তাহলে সরকারি নির্ধারিত নিয়ম ও ফি মেনে একজন সাধারণ নাগরিক কেন মধ্যস্থতাকারীর কাছে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছেন—এ প্রশ্নের পাশাপাশি অফিসের আশপাশে এ ধরনের কার্যক্রম কীভাবে চলছে এবং এর সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে কি না, সেটিও যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সেবাপ্রত্যাশীদের দাবি, পাসপোর্টের নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, সরকারি ফি এবং অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি অফিসের সামনে আরও স্পষ্টভাবে প্রচার করা হলে মধ্যস্থতাকারীদের ওপর নির্ভরশীলতা কমতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, নতুন পরিচালকের ঘোষিত নজরদারি, সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং পুলিশের সহযোগিতায় পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে কথিত মধ্যস্থতাকারীদের তৎপরতা কতটা নিয়ন্ত্রণে আসে।