
রাজ দাশ গুপ্ত
ইউরোপে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ চলছে। এই তাপপ্রবাহের ফলে ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ও জার্মানিতে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ঁ লেকর্নু জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার থেকে এ পর্যন্ত কেবল ফ্রান্সেই তাপপ্রবাহ-সংক্রান্ত ঘটনায় অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে — যাদের বেশিরভাগই নদী বা জলাশয়ে ডুবে মারা গেছেন।
রেকর্ড তাপমাত্রায় পুড়ছে ফ্রান্স
ফ্রান্সের আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ জুনের দিন রেকর্ড হয়েছে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৯.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সোমবার রাতেও সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রা ছিল ২১.৬ ডিগ্রি, যা এখন পর্যন্ত দেশটির উষ্ণতম রাত। দেশের অর্ধেকের বেশি অঞ্চল এখন ‘রেড অ্যালার্ট’ এ রয়েছে।
নদীতে নামতে গিয়ে মৃত্যু
গরম সহ্য করতে না পেরে অনেকে অরক্ষিত নদী ও খালে নামছেন, আর এতেই বাড়ছে দুর্ঘটনা। ফ্রান্সের ক্রীড়া ও যুব মন্ত্রী মারিনা ফেরারি বলেছেন, “তাপপ্রবাহের সময় অরক্ষিত এলাকায় সাঁতার কাটা মোটেই হালকা বিষয় নয়।”
মৃতদের মধ্যে রয়েছে একটি ১৩ বছর বয়সী মেয়ে, যে সাঁতার জানত না। রোববার সন্ধ্যায় পরিবারের সঙ্গে সিন নদীতে নামতে গিয়ে সে ডুবে যায়। এ ছাড়া লিওনের কাছে রোন নদীতে সাঁতার নিষিদ্ধ এলাকায় নামা চার তরুণের মধ্যে একজন পেশাদার তরুণ ফুটবলার এখন আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি।সোমবার দক্ষিণের শহর কার্পঁত্রার একটি পার্কিং লটে দুই শিশু বয়স মাত্র দুই ও চার বছর পরিবারের গাড়ির ভেতরে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তীব্র গরমকেই তাদের মৃত্যুর কারণ বলে ধরা হচ্ছে।
জার্মানিতেও ডুবে মৃত্যু, রাইন নদীতে উদ্বেগ
জার্মানিতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। দেশটির লাইফসেভিং অ্যাসোসিয়েশন (DLRG) জানিয়েছে, শুক্র থেকে রোববারের মধ্যে ছয়টি মারাত্মক সাঁতার দুর্ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণ-পশ্চিমের বিবলিস শহরের কাছে রাইন নদী থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সপ্তাহের শেষে দেশটির পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
স্পেনে ৪৫ ডিগ্রি, ইতালির ১৫ শহরে রেড অ্যালার্ট
স্পেনে আন্দালুসিয়া অঞ্চলের আন্দুহার শহরে সোমবার সর্বোচ্চ ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে। দেশটির আবহাওয়া সংস্থা আয়েমেত জানাচ্ছে, কর্ডোবার কাছাকাছি গ্রামীণ এলাকায় তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রিও ছাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুন মাসে তাপপ্রবাহের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১০টি জুন তাপপ্রবাহ রেকর্ড হয়েছে, অথচ আগের ২৫ বছরে হয়েছিল মাত্র দুটি।
ইতালিতে রোম, মিলান, ফ্লোরেন্স, তুরিন ও ভেনিস-সহ ১৫টি শহরে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। ইতালির সরকার নির্মাণ ও কৃষি শ্রমিকদের দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে কাজ না করার জরুরি সুরক্ষা বিধি পুনর্বহাল করেছে।
আইফেল টাওয়ার বন্ধ, লুভর সংকুচিত
গরমের কারণে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার মঙ্গলবার আগেভাগে বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্বাভাবিক সময়ে রাত সাড়ে বারোটা পর্যন্ত খোলা থাকলেও এদিন বিকেল চারটেতেই বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের সর্বাধিক দর্শনার্থী-আকৃষ্ট জাদুঘর লুভরও বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত বিকেল চারটেয় বন্ধ হবে। লুভর কর্তৃপক্ষ বলেছে, তাদের ঐতিহাসিক ভবন জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যথেষ্ট মানানসই নয়। ইল-দ্য-ফ্রান্স অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট ভালেরি পেক্রেস সকলকে ঘরে থেকে কাজ করার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করেছেন, “রেলের পাতা ৫০ ডিগ্রির উপরে তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে না। ফলে গণপরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দেবে।”
পারমাণবিক চুল্লি বন্ধ
গরমের অভিঘাত পৌঁছে গেছে শক্তি খাতেও। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমে গারোন নদীর তীরে অবস্থিত গলফেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সোমবার রাতে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। ফরাসি আইন অনুযায়ী, চুল্লি ঠান্ডা রাখতে ব্যবহৃত নদীর পানির তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রির উপরে গেলে চুল্লি চালানো যায় না। মঙ্গলবার গারোন নদীর পানির তাপমাত্রা সেই সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর লক্ষণ:
এই তীব্র তাপ প্রবাহ কি গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর লক্ষণ হতে পারে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উত্তপ্ত হওয়া মহাদেশ। কোপার্নিকাস ক্লাইমেট সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে। এর ফলে গ্রীষ্মকালীন তাপপ্রবাহ ঘন ঘন হচ্ছে, পানির সংকট বাড়ছে এবং দাবানল আরও ভয়াবহ হচ্ছে। গত বছর ইউরোপে রেকর্ড ১০ লাখ হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে যায়। নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামেও এই সপ্তাহে তাপপ্রবাহ তীব্র হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। অত্যন্ত অবহেলার সাথে যেভাবে আমরা জৈব জ্বালানি পুড়িয়ে যাচ্ছি তারই ফলস্বরূপ কি আমরা কি এই তাপ প্রবাহ দেখতে পাচ্ছি?