নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন যোগদানের পর থেকে সিন্ডিকেট করে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিযোগিতা দিয়ে আনুপাতিক হারে বেড়ে গেছে । প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যে জড়িত থাকার কর্তা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বিস্তর। পাশাপাশি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কারাবন্দি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া, তাদের স্বজনদের যখন ইচ্ছা তখন দেখা করার সুযোগ করে দেওয়া, জামিন পাওয়ার পর কারাগারে বেইল ফরম পাঠানো হলে জিম্মি করে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের বেসরকারি কারা পরির্দশকরা নিয়মিত পরির্দশন করে তারা বিভিন্ন প্রস্তাবনা দিয়ে আসলেও তাদেরকে কোন প্রস্তাবনাকে গুরুত্ব না দিয়ে চট্টগ্রাম কারাগারকে অনিয়ম দুর্নীতির কারখানায় পরিনত করেছে বলে একাধিক কারা পরির্দশকও অভিযোগ করেন।
গত ২২ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (কারা-১ শাখা) মো. হাফিজ আল-আসাদ স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে ইকবাল হোসেনকে অতিরিক্ত উপ-কারা মহাপরিদর্শক, কারা উপ-মহাপরিদর্শক দপ্তর, চট্টগ্রাম বিভাগে বদলির আদেশ দেওয়া হলেও তিনি এখনো আগের চেয়ার ছাড়েননি। ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও টাকার বিনিময়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের পোস্টটি ধরে রাখতে তিনি মরিয়া বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রায় এক মাস পার হলেও চেয়ার না ছাড়ায় তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। দায়িত্ব না ছাড়ার কারণে নতুন কোনো জেল সুপারকে নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন যোগদানের পর থেকে সিন্ডিকেট করে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা দিলে অনিয়মই নিয়ম হয়ে যায়। টাকার বিনিময়ে উন্নত জীবন যাপনের সব সুবিধা রয়েছে এখানে। কারাগারের ভেতরে মোবাইল ফোনে কথা বলা, ইন্টারনেট ব্যবহার, বন্দি কেনাবেচা, ভালো খাবার কিংবা মাদক-ইয়াবাসহ সবকিছু হাতের নাগালে পাওয়া যায়।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিদের থাকার জন্য ছয়টি পাঁচতলা ভবন রয়েছে। এসব ভবনে দাগি আসামিদের জন্য ১২০টি ওয়ার্ড আছে। অভিযোগ উঠেছে, সব ওয়ার্ডের দাগি অপরাধীদের নিলামে তুলে বিক্রি করা হয়। বড় অপরাধের আসামিরা কারাগারে গেলে তাদের অপরাধের ধরন ও আর্থিক অবস্থা জেনে বিভিন্ন ওয়ার্ডের মেটরা তাদেরকে চিফ রাইটারের কাছ থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে কিনে নেয়। পরে তাদের ওয়ার্ডে রেখে অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বাণিজ্য করা হয়।
কারাগারে বন্দিদের খাবার সঠিকভাবে বণ্টন করা হয় না এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বন্দিদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত খাবারের একটি বড় অংশ আত্মসাৎ করে মাসে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কারাগারের দায়িত্বে থাকা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। এর ফলে নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার পান না সাধারণ কয়েদিরা। চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিদের জন্য দৈনিক ৮৫ বস্তা চাল বরাদ্দ থাকলেও রান্না হয় ৫৫ থেকে ৬০ বস্তা। বাকি চাল বিক্রি করে দেয় ওই সিন্ডিকেট।
এছাড়া বন্দি বেচাকেনা, সাক্ষাৎ বাণিজ্য, প্রকাশ্যে মাদক বেচাকেনা, ওয়ার্ডের সিট বাণিজ্য, খাবার বাণিজ্য, জামিন বাণিজ্য এবং ভিআইপি বন্দিদের উন্নত জীবন যাপনের ব্যবস্থা করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কারাগারের ভেতরের চক্রটি।
চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে যত অনিয়ম-দুর্নীতি হয়, এর অন্যতম নেপথ্যে রয়েছেন এ কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেন, ডেপুটি জেলার মো. রাকিব শেখ, ডেপুটি জেলার তৌহিদুল ইসলাম ও নাসির নামের আরেক কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে, আদালত থেকে জামিনের কাগজপত্র আসলে ভয় দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। দাবিকৃত টাকা না পেলে পুলিশের মাধ্যমে নতুন নতুন মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এ দুই কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় কারারক্ষী থেকে কর্মকর্তা সবাই যেন টাকার কুমিরে পরিণত হয়েছেন।
কোনো বন্দি কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়ে বের হওয়ার সময় নিয়ম অনুযায়ী তার পিসিতে টাকা থাকলে তা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও ডেপুটি জেলার রাকিব শেখ ও তৌহিদুল ইসলাম জোরপূর্বক সেই টাকা নিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পিসির টাকা না দেওয়া পর্যন্ত কাউকে বের হতে দেওয়া হয় না।
নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করতে গিয়ে কারাগারে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য খুঁজে পায় সংশ্লিষ্ট কমিটি। সদ্য জামিনে মুক্তি পাওয়া আসামিরা জানান, বিচারাধীন কিংবা সাজাপ্রাপ্ত কোনো নতুন কয়েদি কারাগারে গেলে প্রথমে তাকে রাখা হয় ‘আমদানি’ ওয়ার্ডে। সেখান থেকেই জেনে নেওয়া হয় তার কী কী প্রয়োজন। সে অনুযায়ী প্রথম রাতেই হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় কারাগারের ভেতরে নগদ অর্থের বিনিময়ে কী কী সুবিধা পাওয়া যায় এমন একটি তালিকা।
কারাগারের ভেতরে সিমকার্ড পেতে গেলে এক ধরনের ‘চার্জ’, মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে চাইলে আলাদা চার্জ। বাইরে কথা বলতে গেলে প্রতি মিনিট হিসেবে গুনতে হয় বাড়তি টাকা। টাকার বিনিময়ে সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় এ কারাগারে। আসামিদের কাছ থেকে চাহিদামতো টাকা পেলে মোবাইল ফোনে বাইরের আত্মীয় স্বজনদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখার সুযোগ করে দেওয়া হয়।
শুধু তাই নয়, কারাগারের ভেতরে চলে মাদকের রমরমা বাণিজ্য। ভেতরেই পাওয়া যায় গাঁজা, মদ, ইয়াবা, আইসসহ ভয়ংকর সব মাদক। বিভিন্ন সময়ে কারাগারের ভেতরে বন্দিদের কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হলেও কেস টেবিলে জেল সুপার বিচার করেন না। নগদ টাকা দিলে তাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ আছে, ডেপুটি জেলার ও জেল সুপারের ব্যক্তিগত লোকদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারের ভেতরে বিশেষ শাখায় পোস্টিং বাণিজ্য চলছে। বাজার থেকে টাকার বিনিময়ে মাদক ও মোবাইল ফোন সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে।
কারাগারে আয়েশি জীবনযাপন করছে কেডিএস খলিলের ছেলে ইয়াছিন, যিনি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। অভিযোগ রয়েছে, টাকার বিনিময়ে তিনি কারাগারে রাজকীয় জীবনযাপন করছেন। শুধু ডিভিশন নয়, তার রুমে রয়েছে দুটি ফ্রিজ, দুটি মোবাইল ফোন ও একটি ল্যাপটপ। পরিবারের সদস্য ও বান্ধবীদের সঙ্গে দেখা করার জন্য কনফারেন্স রুম হিসেবে ব্যবহার করেন জেল সুপারের ব্যক্তিগত কক্ষ। তার নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী ও খাবারও বাইরে থেকে আসে।
চট্টগ্রাম কারাগারে কারা কর্তৃপক্ষের অবহেলায় চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু হয়েছে গত ৩১ জানুয়ারি আব্দুর রহমান (৭০), গত বছরের ১৩ অক্টোবর আবুল কালাম (৪৫), ২৬ এপ্রিল ফারজান হোসেন সজীব (৩৬), ১৫ মে লাল পে কিং বম, ২০২৪ সালের ৫ জানুয়ারি রুবেল দে (৩৮)সহ আরও অনেকের। অভিযোগ রয়েছে, কারা অভ্যন্তরে অমানবিক নির্যাতন ও হামলার কারণেও প্রতি বছর অনেকের মৃত্যু হয়।এর মধ্যে কোতোয়ালী থানাধীন ফারজান হোসেন সজীব (৩৬) কারাগারে নির্যাতনে মারা গেছেন বলে গত বছর ২৫ এপ্রিল দাবি করেন তার স্বজনরা। মৃত সজীব চট্টগ্রাম নগরীর বকশিরহাট এলাকার রামজয় মহাজন লেইনের বাসিন্দা মো. রফিকের ছেলে। তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা ছিলেন।
সজীবের স্ত্রী লাকি আক্তার দাবি করেন, ঘটনার দিন কারাগার থেকে ফোন করে বলা হয়, সজীব কারাগারে মারামারিতে আহত হয়েছেন। চিকিৎসার জন্য ২০ হাজার টাকা নিয়ে আসতে বলা হয়। একই মোবাইল ফোন থেকে কিছুক্ষণ পর জানানো হয়, তার অবস্থা খারাপ এবং তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় জেল সুপার ইকবাল হোসেন মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে পটিয়া উপজেলার মোহাম্মদ আলী নামের এক ব্যক্তি জানান, এক বিএনপি নেতাকে মামলায় ফাঁসানোর পর হাইকোর্ট থেকে জামিনের কপি কারাগারে পাঠানো হলেও বের করতে গেলে কারা কর্তৃপক্ষের আচরণ দেখে মনে হয়েছে তারা বাদীপক্ষের আত্মীয়স্বজন। একপর্যায়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাকে বের হতে হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, জেল গেট থেকে অনেক গরিব-অসহায় মানুষকে আটকে দেওয়া হচ্ছে। যারা টাকা দিতে পারছে না তারা জামিন পাওয়ার পরও বের হতে পারছে না, আর যারা টাকা দিচ্ছে তাদের দ্রুত বের হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। এসব বিষয়ে জেল সুপার ও ডেপুটি জেলার নির্দেশ রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মানবাধিকার উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জাফর হায়দার বলেন, “কারাগারে অমানবিক নির্যাতন এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। অনেক কারাবন্দির কোনো আত্মীয়স্বজন বা আইনি সহায়তা দেওয়ার মতো মানুষ নেই। কারাগারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যদি সৎ না হন, তাহলে বন্দিরা জেলে থেকেও যদি টাকার বিনিময়ে সব সুবিধা পায়, তাহলে তাদের জেলে রাখার প্রয়োজন কী? কারাগারের অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।”
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, “বদলির যে আদেশ হয়েছে, সেটা অভ্যন্তরীণ আদেশ। আমাকে চট্টগ্রামের বাইরে কোথাও দেওয়া হয়নি।” তবে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কারাগারে সেবার মান আমি চাইলে ইচ্ছামতো বাড়াতে পারি না। তবে আগের তুলনায় কোথাও কোথাও সেবার মান কমে থাকলে আমি চেষ্টা করব তা বাড়াতে। যদি আমার নাম ব্যবহার করে অফিস স্টাফরা কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি করে থাকে এবং কেউ অভিযোগ করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”