নিজস্ব প্রতিনিধি
উপকূলীয় বন বিভাগ চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ রেঞ্জে দীর্ঘ এক দশক ধরে জেঁকে বসেছেন ডেপুটি রেঞ্জার মো. নিজাম উদ্দীন। বন অধিদপ্তরের বিদ্যমান বদলি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একই কর্মস্থলে টানা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে অবস্থান করছেন তিনি, যা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার চরম লঙ্ঘন হলেও দেখার যেন কেউ নেই। সন্দ্বীপ রেঞ্জের অধীনে সুফল প্রকল্প, চর বনায়ন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের বিশাল অংকের বরাদ্দকৃত অর্থে শত শত হেক্টর বাগান সৃজনের যে খতিয়ান সরকারি নথিতে দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সন্দ্বীপের বিস্তৃত এলাকা আজ ধূধূ মরুভূমি ও বৃক্ষশূন্য প্রান্তর হিসেবে পড়ে থাকলেও নথিপত্রে সেখানে সবুজ বনায়নের চিত্র তুলে ধরে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে। এই দুর্নীতির মহোৎসবে নাম জড়িয়েছে সাবেক দুই বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আব্দুর রহমান ও বেলায়েত হোসেনের। অভিযোগ রয়েছে যে, বাগান সৃজনের নামে বরাদ্দকৃত অর্থের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত উৎকোচ হিসেবে গ্রহণ করেছেন তারা, যার ফলে বনায়ন প্রকল্পটি শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। এমনকি সাবেক ডিএফও আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—ডেপুটি রেঞ্জার নিজাম উদ্দীনের স্থায়ী নিবাস সন্দ্বীপ উপজেলায়। নিজ এলাকায় পদায়িত হওয়ার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি গত ১০ বছর ধরে বন বিভাগে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার ও নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজাম উদ্দীনের এই বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের পেছনে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছেন সাবেক ডিএফও বেলায়েত হোসেন, যার নিজের বাড়িও সন্দ্বীপে। একই এলাকার লোক হওয়ার সুবাদে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে এক অভেদ্য সিন্ডিকেট। বন রক্ষা বা রক্ষণাবেক্ষণের বিন্দুমাত্র কাজ না করেই সরকারি তহবিলের অর্ধেক বা তার বেশি অংশ নিজেরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন এই দুই কর্মকর্তা। চরাঞ্চলের যে বিশাল এলাকাজুড়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার কথা ছিল, তা আজ কেবল মরুভূমির বালুচরে পরিণত হয়েছে।
দুর্নীতির জাল আরও গভীরে বিস্তৃত হওয়ার প্রমাণ মেলে যখন জানা যায় যে, সন্দ্বীপের বনভূমির প্রায় ৮০ শতাংশ জায়গা ডিএফও বেলায়েত হোসেন এবং নিজাম উদ্দীন তাদের পারিবারিক সম্পত্তির মতো ব্যবহার ও ভাগ-বাটোয়ারা করে নিয়েছেন। সরকারি বনভূমিকে নিজেদের ব্যক্তিগত খাতে নেওয়ার বিষয়ে একাধিকবার অভিযোগ উঠলেও এক অদৃশ্য শক্তির ইশারায় আজ পর্যন্ত কোনো তদন্ত আলোর মুখ দেখেনি। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এবং আর্থিক সুবিধাভোগের প্রবণতা এই দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। দেশের পরিবেশ রক্ষা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের জানমাল রক্ষায় যে বন অত্যন্ত জরুরি, তাকে পুঁজি করেই নিজাম ও তার সহযোগীরা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। অবিলম্বে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত টিম গঠন করে এই দীর্ঘমেয়াদী দুর্নীতির মূল উৎপাটন করা জরুরি। মাঠ পর্যায়ে সরেজমিনে তদন্ত করলে বেরিয়ে আসবে কীভাবে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প কোনো চারা রোপণ ছাড়াই গিলে ফেলেছে এই সিন্ডিকেট। দেশের স্বার্থে এবং সন্দ্বীপের উপকূলীয় ভারসাম্য রক্ষায় এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় এনে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা সময়ের দাবি।