অভি পাল
দিগন্তজোড়া ঝাউবনের মায়াবী সবুজ, সুবিস্তৃত বালুচর আর বঙ্গোপসাগরের উত্তাল গর্জনে ঘেরা কক্সবাজারের পরেই দেশের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সৈকত চট্টগ্রামের বাঁশখালী। প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উপকূলজুড়ে প্রকৃতির অপরূপ রূপ ছড়ানো থাকলেও, অপার সম্ভাবনাময় এই পর্যটন কেন্দ্রটি এখন চরম অবহেলা আর অযত্নে ধুঁকছে। সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিন দিন এটি তার আকর্ষণ হারাচ্ছে। অথচ একটু সুনজর আর আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই নির্জন ও দৃষ্টিনন্দন সৈকতটি হতে পারত চট্টগ্রামের অন্যতম শীর্ষ রাজস্ব আয়ের উৎস।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কক্সবাজার কিংবা পতেঙ্গা সৈকতের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় বাঁশখালীর এই দীর্ঘ উপকূলীয় সৈকত। বিশেষ করে খানখানাবাদ, বাহারছড়া ও কদমরসুল সংলগ্ন সমুদ্র সৈকতের লাল কাঁকড়ার অবাধ বিচরণ আর সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য সচরাচর অন্য কোথাও দেখা যায় না। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের জন্য নেই কোনো বসার সুব্যবস্থা, নেই কোনো ভালো মানের রেস্তোরাঁ কিংবা ওয়াশ রুমের সুবিধা। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসুদের, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের তীব্র ভোগান্তি পোহাতে হয়।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও যাতায়াত খরচ। বাঁশখালী প্রধান সড়ক থেকে সৈকতে যাওয়ার সংযোগ সড়কগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক ও ভাঙাচোরা। খানাখন্দে ভরা এই রাস্তাগুলোর কারণে গণপরিবহন তো দূরের কথা, সিএনজি বা অটোরিকশাও সহজে যেতে চায় না, আর গেলেও পর্যটকদের কাছ থেকে দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া দাবি করা হয়। এই দীর্ঘ ও ভোগান্তিময় রাস্তা পার হয়ে সৈকতে পৌঁছাতেই পর্যটকদের চরম ক্লান্তি গ্রাস করে। এছাড়া সৈকত এলাকায় পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং স্থায়ী কোনো নিরাপত্তা চৌকি বা ট্যুরিস্ট পুলিশের নজরদারি না থাকায় সন্ধ্যার পর সেখানে এক ধরনের ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি হয়। মাঝেমধ্যেই বখাটেদের উৎপাত ও ছিনতাইয়ের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটায় সাধারণ পর্যটকদের মনে নিরাপত্তার শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ভৌগোলিক ও পরিবেশগত দিক থেকেও সৈকতটি এখন বড় ধরনের হুমকির মুখে রয়েছে। টেকসই বেড়িবাঁধ ও স্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের তোড়ে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রতি বছরই সৈকতের বিশাল অংশ ও সৌন্দর্য বর্ধনকারী শত শত ঝাউগাছ সাগরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। একই সাথে, এখানে কোনো ডাস্টবিন বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ম না থাকায় পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ও চিপসের প্যাকেট পুরো সৈকত জুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। জোয়ারের পানিতে এসব প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে মিশে সামুদ্রিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি করছে, যা দেখার যেন কেউ নেই।
এদিকে, যথাযথ প্রচারের অভাবে এই সৈকতটি এখনো বৃহত্তর চট্টগ্রামের বাইরে দেশের মানুষের কাছে অচেনাই রয়ে গেছে। সরকারি পর্যটন কর্পোরেশন বা কোনো পর্যটন বুকলেটে এই অপরূপ সৈকতের নাম স্থান পায়নি। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে যদি দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা যায়, তবে বাঁশখালী সমুদ্র সৈকত দেশের পর্যটন শিল্পে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। একই সাথে এটি স্থানীয় তরুণদের বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল করতে বড় ভূমিকা রাখবে। প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ রক্ষায় এবং একে একটি বৈষম্যহীন, নিরাপদ ও আদর্শ পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তুলতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।