1. editor@purbobabgla.net : Web Editor : Web Editor
  2. admin@purbobangla.net : purbabangla :
  3. jashad1989@gmail.com : Web Editor : Web Editor
নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর নজরুল - পূর্ব বাংলা
শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ০৮:২৯ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
সাংবাদিকদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে না সরকার: তথ্য প্রতিমন্ত্রী নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর নজরুল মার্কিন ভিসা নিয়ে বাংলাদেশিদের জন্য নতুন বার্তা ঠান্ডা মিয়া গরম কথা (৩৫৯) মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহা পরিচালক মোঃ হাসান মারুফ সমীপে কক্সবাজারে বিজিবির অভিযানে ১৬ কোটি ৮৩ হাজার টাকার ইয়াবা উদ্ধার চাঁপাইনবাবগঞ্জে বজ্রপাতে নারীসহ নিহত ৬ দিল্লির হোটেলে অগ্নিকাণ্ড: অন্তত ৫ বাংলাদেশি আহত, ৩ জন আশঙ্কাজনক বরগুনায় ডাকবাংলো থেকে ২ শিশুসহ মায়ের মরদেহ উদ্ধার ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের আত্মপ্রকাশ-আহ্বায়ক শফিক রেহমান যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক যেন এক মরণফাঁদ: যাত্রী সাধারণের চরম উদ্বেগ

নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর নজরুল

পূর্ব বাংলা ডেস্ক
  • প্রকাশিত সময়ঃ শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ২৪ বার পড়া হয়েছে

সাঈফী আনোয়ারুল আজীম

 ১৮৯৯ সালের ২৫ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা সাহিত্যের এই অনন্য প্রতিভাবান কবি । বহুমাত্রিক সাহিত্য সাধনা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন ও মানবমুক্তির সংগ্রামে সোচ্চার কণ্ঠস্বরের জন্য তিনি হয়ে উঠেছেন সাম্য, বিপ্লব ও বিদ্রোহের চিরন্তন প্রতীক। নজরুলকে বুঝতে হলে শুনতে হয় বাংলার শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘশ্বাস, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তরুণদের অস্থিরতা, ধর্মীয় বিভাজনে ক্লান্ত মানুষের আর্তি এবং অবহেলিত নারীর কান্না। তিনি সেইসব কণ্ঠকে ভাষা দিয়েছিলেন। তাঁর কলমে বিদ্রোহ ছিল, কিন্তু সেই বিদ্রোহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানুষ।

চুরুলিয়ার দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ছোটবেলায় মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ করেছেন, লেটো দলে গান লিখেছেন, রুটির দোকানে কাজ করেছেন এবং পরে সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। জীবনের শুরু থেকেই তিনি অভাব, অপমান ও অনিশ্চয়তার স্বাদ পেয়েছিলেন। ফলে নিপীড়িত মানুষের যন্ত্রণা তাঁর কাছে কল্পনার বিষয় ছিল না; ছিল জীবন্ত বাস্তবতা।

ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে নজরুল ছিলেন অগ্নিসেনার মতো সাহসী। তাঁর কলম ছিল অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক দুর্বার অস্ত্র। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তিনি ঘোষণা করেছিলেন বিদ্রোহ। তাঁর রচিত কবিতা ও গান ব্রিটিশ শাসকদের কাছে হয়ে উঠেছিল ভয়ের কারণ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের পর সমগ্র ভারতবর্ষে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে তিনি লিখেছিলেন “মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্তআমি সেই দিন হব শান্ত,যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোলআকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না।”

এই উচ্চারণ শুধু কবিতার পঙক্তি নয়; এটি ছিল শোষিত মানুষের মুক্তির শপথ। নজরুলের কবিতা আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামী মানুষকে সাহস ও প্রেরণা জোগায়। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর কবিতা ও গান মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল।

তিনি জনগণকে কখনো নীরব বা নিষ্ক্রিয় সত্তা হিসেবে দেখেননি। বরং তাঁদের সংগ্রাম, ক্ষোভ ও বঞ্চনাকে তিনি সাহিত্যিক শক্তিতে রূপ দিয়েছেন। ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় তিনি লিখেছিলেন

“দেখিনু সেদিন রেলেকুলি ব’লে এক বাবু সা’বতারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে।”
নজরুল ছিলেন শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের কবি। তিনি শোষিত, বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন নির্ভয়ে। তাঁর বজ্রকণ্ঠ উচ্চারণে ফুটে ওঠে বিপ্লবী চেতনা ও শোষণের বিরুদ্ধে ক্ষোভ—

নজরুল তাঁর সাহিত্যকর্মে বারবার উচ্চারণ করেছেন সাম্য, মানবতা ও মুক্তির বাণী। তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা শ্রেণিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে দেখেছেন শুধু মানুষ হিসেবে। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সাম্যবাদী’-তে তিনি লিখেছেন, “গাহি সাম্যের গান , মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” এই চেতনা থেকেই নজরুল হয়ে ওঠেন প্রকৃত মানবতাবাদী কবি। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো উপাসনালয় নেই। তাই তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই।” হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষের মিলনকেই তিনি দেখেছেন মানবসভ্যতার সৌন্দর্য হিসেবে। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে সম্প্রীতির জয়গান “মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।”

শুধু সাম্যের আহ্বানই নয়, নজরুল ছিলেন বিপ্লব ও জাগরণের কবি। অন্যায় ও দাসত্বের বিরুদ্ধে মানুষকে জাগিয়ে তুলতে তিনি রচনা করেন ‘কারার ঐ লৌহকপাট’, ‘ভাঙার গান’, ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’, ‘সর্বহারা’সহ অসংখ্য কালজয়ী কবিতা ও গান। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁর লেখা ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানটি শাসকদের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল— “কারার ঐ লৌহ কপাটভেঙে ফেল, কর রে লোপাটরক্ত জমাট শিকল-পূজার পাষাণ বেদী।”

“প্রার্থনা করো— যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ।”

নজরুলের সাহিত্য কেবল দেশপ্রেমেই উদ্বুদ্ধ করে না; বরং মানবিক, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের শিক্ষাও দেয়। তাঁর কবিতা আমাদের সাহস জোগায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে।

তাঁর সাহিত্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতার বিরুদ্ধে অবস্থান। রাষ্ট্র, সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, শ্রেণিশোষণ, ধর্মীয় কুসংস্কার কিংবা সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ ছিল স্পষ্ট ও নির্ভীক। ফলে তাঁর সাহিত্য সামাজিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে ওঠে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—নজরুলের গণমুখী সাহিত্য কতটা স্থায়ী সামাজিক পরিবর্তন আনতে পেরেছে? এর সহজ উত্তর নেই। সাহিত্য একা সমাজ বদলায় না; কিন্তু সাহিত্য মানুষের চেতনা বদলায়, আর সেই চেতনা থেকেই সামাজিক পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়। নজরুল সেই চেতনার অন্যতম নির্মাতা।

আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিনে আমাদের প্রত্যাশা—সমাজে ফিরে আসুক তাঁর সাম্যের বাণী, মানবতার চেতনা ও প্রতিবাদের সাহস। বিভেদ, হিংসা ও বৈষম্যের এই সময়ে তাঁর কণ্ঠ আজও সমান প্রাসঙ্গিক—

“গাহি সাম্যের গান—যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।”

নজরুল চিরকাল বেঁচে থাকবেন তাঁর বিদ্রোহে, মানবতায় এবং সাম্যের আহ্বানে। তিনি ছিলেন এবং থাকবেন নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর।

শেয়ার করুন-
এই বিভাগের আরও খবর
© All rights reserved © 2021 purbobangla