
নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঁশখালী
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সাধনপুর ইউনিয়নে এক উপ-ঠিকাদার ও রাজনৈতিক নেতাকে প্রকাশ্য দিবালোকে অবরুদ্ধ করে ৫ লক্ষ টাকা চাঁদা দাবি, চাঁদা না পেয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার চেষ্টার অভিযোগে বাঁশখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি নালিশী মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর মাতা রোকসানা জান্নাত বাদী হয়ে সাধনপুর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল হামিদ এবং তার ভাই শ্রমিক দল নেতা আব্দুল মান্নানসহ ৮ জন নামীয় ও অজ্ঞাতনামা বেশ কয়েকজন সক্রিয় সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করেন।
নালিশী দরখাস্তের সূত্র অনুযায়ী, বিজ্ঞ আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে সি.আর মামলা নং- ৮১৯/২০২৬ইং (বাঁশখালী) মূলে নথিভুক্ত করেছেন। মামলার আসামিরা হলেন— ১. আব্দুল মান্নান (৩৬), ২. আব্দুল হামিদ (৫০), ৩. আব্দুল ওয়াহেদ (৩৯), ৪. মোঃ ফরহাদ (২৮), ۵. মোঃ ওয়াসিম (২০), ৬. মোঃ হৃদয় (২৩), ৭. নুরুল আমিন (৫২), এবং ৮. মোঃ আরাফাত (২১)। আসামিদের সবার বাড়ি উপজেলার সাধনপুর ইউনিয়নের পশ্চিম বৈলগাঁও (২নং ওয়ার্ড) এলাকায়।
আইনি ধারা ও অভিযোগের ভয়াবহতা:
মামলার আরজিতে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি (Penal Code) এর ৩৪১/৩২৩/৩২৪/৩২৫/৩০৭/৩৮৫/৩৭৯/৫০৬(২)/৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। ধারাগুলোর মধ্যে রয়েছে— বেআইনিভাবে পথরোধ (৩৪১), স্বেচ্ছায় সাধারণ ও মারাত্মক জখম করা (৩২৩, ৩২৫), মারাত্মক অস্ত্র দ্বারা আঘাত (৩২৪), হত্যার উদ্দেশ্যে প্রাণঘাতী হামলা (৩০৭), চাঁদা দাবি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন (৩৮৫, ৫০৬) এবং চুরির (৩৭৯) মতো গুরুতর অপরাধ।
ঘটনার বিবরণ ও চাঁদাবাজি:
মামলার আরজি ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, হামলার শিকার ভুক্তভোগী মোঃ সোহেল কাদের রানা জাতীয়তাবাদী তরুণ দল বাঁশখালী উপজেলা শাখার ১নং যুগ্ম আহ্বায়ক এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদল ও স্থানীয় পশ্চিম বৈলগাঁও জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। তিনি বাঁশখালী উপজেলার আওতাধীন বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ইট, বালু ও কংক্রিট সরবরাহের সাব-ঠিকাদারি ব্যবসা করে আসছিলেন। তার তিন বড় ভাই দীর্ঘ বছর ধরে প্রবাসী। আসামিরা কোনো বৈধ আয়ের উৎস ছাড়াই এলাকায় চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকায়, সোহেলকে বেশ কিছুদিন ধরে টার্গেট করে আসছিল। ঘটনার ২/৩ দিন পূর্বেও ১ ও ২ নং আসামি সোহেলের নিকট থেকে মোটা অংকের মাসোহারা দাবি করে এবং হুমকি দেয়।
এরই ধারাবাহিকতায়, গত ১৩/০৬/২০২৬ইং তারিখ রাত আনুমানিক ১০:৩০ ঘটিকায় ব্যবসায়ী সোহেল কাদের রানা কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে পশ্চিম বৈলগাঁও হাজীর পাড়া ইন্দ্র নারায়ণ রোডস্থ ফোরকান সওদাগরের দোকানের সামনে পৌঁছামাত্র পূর্ব থেকে ওত পেতে থাকা আসামিরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তার গতিপথ রোধ করে। ১, ২ ও ৩ নং আসামি সরাসরি সোহেলের বুকে দেশীয় অস্ত্র ঠেকিয়ে ৫,০০,০০০/- (পাঁচ লক্ষ) টাকা চাঁদা দাবি করে।
নৃশংস হামলা ও চুরির তাণ্ডব:
সোহেল কাদের রানা উক্ত অবৈধ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ১নং আসামি আব্দুল মান্নান হত্যার উদ্দেশ্যে তার হাতে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে সোহেলের ঘাড়ের পেছনে কোপ মেরে মারাত্মক শরীর জখম করে। ২নং আসামি (ইউপি সদস্য) আব্দুল হামিদ লোহার রড দিয়ে সোহেলের বুকে সজোরে আঘাত করে হাড়ভাঙা জখম করে। ৩ ও ৪ নং আসামি লোহার রড ও কিরিচ দিয়ে তার ডান পায়ে এবং মেরুদণ্ডে আঘাত করে গুরুতর জখম করে রাস্তায় ফেলে দেয়। সোহেল মাটিতে লুটিয়ে পড়লে ৬ থেকে ৮ নং আসামিরা তার পকেট থেকে নগদ ৩০,০০০/- (তিল লক্ষ নয়, ৩০ হাজার) টাকা এবং ব্যবহৃত ২টি দামী (স্মার্টফোন) জোরপূর্বক লুট করে নিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন টর্চ ও বিদ্যুতের আলোতে আসামিদের শনাক্ত করে এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় সোহেলকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মামলার সাক্ষী হওয়ায় মামার ওপর পুনরায় হামলা ও নাকের হাড় গুঁড়ো:
আদালতে এই মামলা দায়েরের পর আসামিরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এই মামলার ৩নং সাক্ষী এবং আহত সোহেলের বড় মামা মোঃ মোক্তার আহমদের ওপর চরম ক্ষিপ্ত হয় ইউপি সদস্য হামিদ ও শ্রমিক দল নেতা মান্নানের সন্ত্রাসী বাহিনী। এর জের ধরে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে শ্রমিক দল নেতা আব্দুল মান্নান, ইউপি সদস্য আব্দুল হামিদ, নুরুল আমিন, ওয়াহিদ ও ফরহাদসহ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মোক্তার আহমদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা তাকে এলোপাতাড়ি মারধর ও উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে। হামলায় মোক্তার আহমদের নাকের হাড় সম্পূর্ণ ভেঙে যায় এবং তার বুকের পাজরে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সেখানে তার নাকে ও বুকে সফল অস্ত্রোপচার (অপারেশন) সম্পন্ন হয়। এই ঘটনায় মোক্তার আহমদের বোন রওশন জান্নাত বাদী হয়ে বাঁশখালী থানায় আরেকটি পৃথক ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন।
জায়গা-জমি দখল ও টেন্ডারবাজিই মূল পেশা, অতিষ্ঠ এলাকাবাসী:
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ইউপি সদস্য আব্দুল হামিদ ও তার ভাই আব্দুল মান্নান রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছে। সাধারণ মানুষের জায়গা-জমি দখল এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডারবাজিই মূলত এই বাহিনীর প্রধান পেশা। তাদের এসব অপকর্মে পুরো সাধনপুরবাসী চরম অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও আসামিদের ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে থানায় ও আদালতে একাধিক ফৌজদারি মামলা থাকলেও অজানা কারণে তারা পার পেয়ে যাচ্ছে, যার ফলে তাদের দাপট ও অপরাধ প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।
ভুক্তভোগী পরিবার এবং স্থানীয় সচেতন মহল অনতিবিলম্বে এই চিহ্নিত সন্ত্রাসী, ভূমিদস্যু ও চাঁদাবাজ চক্রকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন, যাতে সাধনপুরবাসী স্বস্তি ফিরে পায়।