মুয়াযের বুদ্ধিমত্তা বিকাশ অতীব জরুরী
এম. জসিম উদ্দিন
সন্তানের চোখে বাবাই হচ্ছে সবচেয়ে কাছের পৃথিবী। সেই শৈশবে বাবার আঙুল ধরে শুরু হয় সন্তানের পথচলা। কৈশোরের দুরন্তপনার সঙ্গী হচ্ছে বাবা। একজন আদর্শবান বাবার চোখেই সন্তান দেখতে শেখে পৃথিবীর আলো আর অন্ধকারের মতো মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখের ক্ষণস্থায়ী বিচরণ এবং একজন আদর্শবান বাবার মস্তিষ্কেই তার সন্তান অনুভব করতে শেখে প্রতিটি মানুষরই সম-অধিকার বেঁচে থাকার প্রাপ্যতা আছে। অনুরূপভাবে একজন আদর্শবান বাবার কারণেই সন্তান শুনতে শেখে তার চারপাশের সৎ এবং সত্য মানুষগুলোর তৃপ্তি হাসি। অপরদিকে অসততা ও মিথ্যাপুষিত জীবনের আহাজারি বাবার শরীর দিয়েই একটি সন্তান অনুভব করতে শেখে যে এই পৃথিবীটা বেঁচে থাকার তাগিদে কতটা শ্রম আর কতটা ঘাম ঝড়াতে হয়। সুতরাং বাবাদের আদর-শ্নেহ, ভালোবাসা সব সময়ই অমর।
সেই আদর্শবান এক বাবা ও তার তিন বছরের শিশু সন্তান মুয়ায মোহাম্মদকে নিয়ে আজকের আয়োজন চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার দক্ষিণ শিলাইগড়ার মৃত মৌলানা শেখ আবুল বশরের চতুর্থ সন্তান শেখ মোহাম্মদ বোরহান উদ্দিন। বোরহান একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ২০১৩ সালে ভালোবেসে ইসলামী রীতিনীতি অনুযায়ী বিয়ে করেছিলেন খুলশি থানাধীন লালখান বাজার এলাকার অস্থায়ী বাসিন্দা আমির মোহাম্মদ ফয়সালের কন্যা ফাতেমা আমির বিভোরকে। এই দম্পতির ঘরে ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে ভূমিষ্ট হয় শিশু সন্তান মুয়ায মোহাম্মদ। শেখ বোরহানের অভিযোগ, সন্তান ভূমিষ্ট হবার পর থেকে নবজাতককে বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত করার নানান অজুহাত খাড়া করেছিলেন ফাতেমা আমির বিভোর। মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত করার জন্যে ভ্রুন নষ্ট করার মতো জঘন্যতম ঘঠনাও ঘটিয়েছেন শিশু সন্তানের মা বিভোর। বোরহান বলেন, সন্তানকে বাঁচাতে ও তার পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্যে সূদুর লন্ডন থেকে চড়া দামে বিকল্প দুধ কিনে এনে সন্তানের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হই। পরে ভ্রুন হত্যার অভিযোগ এনে ফাতেমা আমির বিভোর এবং বিভোরের অপরাপর সহযোগী শেফা, আমির মোহাম্মদ বেলাল, মাইফুল আকতার সুলতানাকে আসামী করে চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে মামলা রুজু করেন শেখ বোরহান। যার মামলা নম্বর ২৪৫/২০২১, তারিখ ৮/৯/ ২০২১ । বোরহানের কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ফয়সাল মোহাম্মদ আমির ও পরিবারের সকল সদস্য ও সদস্যারা পেশাদার কাবিন ব্যবসায়ী এবং সংঘবদ্ধ একটি প্রতারক চক্র। যে কারণে বলির পাঠা হতে হচ্ছে অবুঝ শিশু মুয়ায মোহাম্মদ’কে। মামলা সূত্রে জানা যায়, শেখ বোরহানের শশুর-শাশুড়ীসহ তাদের পরিবারের অন্যন্য সদস্যরা উচ্ছৃঙ্খল, পর সম্পদ লোভী ও আত্মসাৎকারী হওয়ায় শেখ বোরহান ও বিভোরের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ, মনমালিন্য ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে কয়েকবার। উভয় পক্ষে মামলা, পাল্টা মামলাও রুজু হয়েছে। শিশু সন্তান মুয়ায মোহাম্মদের ভবিষ্যৎ জীবন চিন্তা করে তালাক সংক্রান্ত বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। সমাজের গণমান্য ব্যক্তিদের সুপরামর্শে স্ত্রী বিভোরকে পূনরায় ঘরে তুলে নতুনভাবে সংসারজীবন শুরু করতে থাকে শেখ বোরহান ও স্ত্রী বিভোর । নতুন সংসার শুরুর কিছুদিন পরেই হয়ে গেলো বিধিবাম। স্বামীর অজান্তে মা-বাবার প্ররোচনায় শিশু মুয়ায ও শেখ বোরহানের দুটি পাসপোর্ট, টাকা-পয়সা ও মূল্যবান মালামাল নিয়ে বাপের বাড়ি চলে আসে স্ত্রী বিভোর। পরে স্ত্রী বিভোর ও চাচা আমীর মোহাম্মদ বেলালকে আসামী করে পাসপোর্ট চুরি সংক্রান্ত আদালতে একটি মামলাও রুজু হয়েছে। আদালতের নির্দেশে আনোয়ারা থানার পুলিশ পাসপোর্ট দুটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে পাসপোর্ট দুটি পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ জুয়েল এর হেফাজতে রয়েছে। যার পাসপোর্ট নাম্বার ইখ ০৪৫৭৪৩২-ঈ-১৯০৪২১৯।
এ বিষয়ে জানতে বিভোর ও তার মা-বাবাকে একাধিকবার ফোন করলে (০১৮১৬৪৪১১১৫- ০১৭২৬৭০৭৫২২) তারা এই প্রতিবেদকে গালমন্দ করে ফোন কেটে দেয়।
শৈশবে অবজ্ঞা ও মানসিক নির্যাতন বিষয়ে জানতে গত ১৯/০২/২০২২ ইংরেজি তারিখে প্রতিবেদক ছুটে যান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে। সংস্থাটির ইনচার্জ ও আবাসিক চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম বলেন, শিশুর বিকাশকালে মানসিক অবজ্ঞা ও মানসিক নির্যাতন জটিল একটি বিষয়। এটা অন্যন্য শারীরিক নির্যাতনের মতো। সাধারণত ছোটোবেলায় যারা অবহেলা ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়, পরবর্তী সময়ে তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও জ্ঞানের বিকাশজনিত সমস্যা হয়ে থাকে। তিনি বলেন, শিশুর জন্মের পর প্রথম পাঁচবছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা সময়। কারণ ৬/৭ মাস বয়স থেকে পাঁচবছর বয়সের মধ্যে আবেগীয় সম্পৃক্ততার (ইমোশনালি অ্যাটাচমেন্ট) বিকাশ হয়ে থাকে। এজন্যই এই সময়টা খুব সচেতনতার সঙ্গে শিশুকে লালন-পালন করতে হয়। যাতে সে কোনোভাবেই অবজ্ঞা ও মানষিক নির্যানের শিকার না হয়ে থাকে । শিশু সন্তান মুয়ায মোহাম্মদকে নিয়ে যা ঘটছে তা ফৌজদারি অপরাধের অংশ । সাইফুল ইসলাম বলেন, ঘটনাগুলো যে বা যাঁরাই ঘটাক না কেন দেশের প্রচলিত আইনে তাদেরকে শাস্তি দিতে হবে ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক নুর বেগম বলেন, শিশুর মৌলিক অধিকারগুলোকে অনিচ্ছাকৃতভাবে পূরণ না করার নামই হলো অবজ্ঞা । অর্থাৎ মৌলিক চাহিদাগুলোর প্রতি উদাসীন থাকা বা পাত্তা না দেয়া।
যেমন: প্রয়োজনীয় খাদ্য, বস্ত্র, নিরাপদ আশ্রয় ও আবেগীয় নিরাপত্তা না দেয়া। এছাড়া শিশুর বুদ্ধিমত্তা বিকাশের জন্যে প্রয়োজনীয় উদ্দীপক, পারস্পরিক সামাজিক সম্পর্ক, কথোপকথন ইত্যাদি থেকে শিশুদের বঞ্চিত করার নামই হলো অবজ্ঞা। তাই অবুঝ শিশু মুয়ায মোহাম্মদকে নিয়ে যা ঘটতে চলেছে সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়। এই স্বাস্থ্য পরিদর্শক বলেন, শিশুর প্রতি এহেন আচরণ ফৌজদারি অপরাধ ছাড়া আর কিছুই নয় ।