মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, পরিকল্পনা কমিশন ও সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
বাংলাদেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবিক মূল্যবোধ এবং প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত ‘মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও শিক্ষামূলক উদ্যোগ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে ৬৪টি জেলায় এই কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে আসছে।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, প্রকল্পটির পরবর্তী পর্যায় একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকায় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট হাজার হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মকর্তা-কর্মচারী চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭,৪০০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ৫০০-এর অধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী গত চার মাস ধরে বেতন-ভাতা না পাওয়ার সংকটে রয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। অর্থাৎ, এই সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছেন আমাদের দেশের অসংখ্য নারী, যাঁরা একদিকে শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন, অন্যদিকে নিজেদের সংসার ও পরিবারের দায়িত্বও সামলাচ্ছেন।
অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকার মাসিক সম্মানী মাত্র ৫,০০০ টাকা। অথচ সেই সামান্য অর্থটুকুও চার মাস ধরে না পাওয়ায় তাঁদের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
একবার ভাবুন, একজন নারী শিক্ষক সারাদিন শিশুদের হাতে বই তুলে দিচ্ছেন, তাদের অক্ষরজ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করছেন। অথচ নিজের সন্তানের স্কুলের বেতন দিতে পারছেন না, পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করতে পারছেন না, চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পারছেন না। একজন নারী শিক্ষক যখন নিজের সংসারের আর্থিক সংকট আড়াল করে প্রতিদিন অন্যের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে নিয়োজিত থাকেন, তখন তাঁর মনের কষ্ট কতটা গভীর হতে পারে, তা কি আমরা একবারও অনুভব করছি?
এই ৮০ শতাংশ নারী শিক্ষক শুধু একটি প্রকল্পের কর্মী নন; তাঁরা প্রত্যেকে একটি পরিবারের আশ্রয়, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং সমাজের শিক্ষার অন্যতম আলোকবর্তিকা। তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু কর্মসংস্থানের বিষয় নয়, এটি নারীর মর্যাদা, আত্মনির্ভরতা ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে চার মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া থাকা মানে শুধু একজন কর্মীর আর্থিক সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার পরিবারের অন্ন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
অন্যদিকে, ৬৪টি জেলা পর্যায়ের কার্যালয় পরিচালনা, অফিসের আনুষঙ্গিক ব্যয় এবং প্রকল্পের প্রশাসনিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।
আমি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছি, তাঁদের মূল আকুতি সরকারের প্রতি কোনো অভিযোগ নয়, কোনো বিরোধও নয়। তাঁদের একটাই প্রত্যাশা—প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদিত হোক, তাঁদের কর্মসংস্থান ও জীবিকার অনিশ্চয়তা দূর হোক এবং শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত থাকুক।
আমার বিনীত প্রশ্ন, যাঁরা শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে নিয়োজিত, বিশেষ করে যাঁদের ৮০ শতাংশ নারী, তাঁদের নিজেদের ভবিষ্যৎ কি এভাবে অনিশ্চিত থাকবে?
মাননীয় সরকারের কাছে আমার আকুল আবেদন—
১. মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের পরবর্তী পর্যায়ের প্রকল্পটি দ্রুততম সময়ে একনেকে উপস্থাপন ও অনুমোদনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
২. প্রকল্প অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানবিক সংকট বিবেচনায় অন্তর্বর্তীকালীন আর্থিক সহায়তা অথবা আইনসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা হোক।
৩. বিগত চার মাসের বকেয়া বেতন-ভাতা দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা করা হোক।
৪. ৮০ শতাংশ নারী শিক্ষক-শিক্ষিকার আর্থিক ও পারিবারিক সংকটকে বিশেষ মানবিক গুরুত্ব দিয়ে তাঁদের সম্মানী ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা প্রদানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক।
৫. ৬৪টি জেলার কার্যক্রম এবং হাজার হাজার শিশুর শিক্ষা যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
আমি বিশ্বাস করি, বর্তমান সরকার মানবিক মূল্যবোধ, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এই প্রকল্পের সঙ্গে শুধু একটি শিক্ষা কার্যক্রম নয়, জড়িয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান, অসংখ্য শিশুর শিক্ষার অধিকার এবং বহু পরিবারের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
বিশেষ করে ৮০ শতাংশ নারী শিক্ষক-শিক্ষিকার জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে হাজার হাজার পরিবারের মুখে হাসি ফিরিয়ে দেওয়া। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো মানে নারীশিক্ষা ও নারীর আত্মমর্যাদার পাশে দাঁড়ানো।
একটি প্রকল্পের অনুমোদন হয়তো সরকারি প্রশাসনের একটি প্রক্রিয়া, কিন্তু সেই অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা হাজার হাজার মানুষের কাছে এটি তাঁদের জীবনের আশার আলো।
আমরা সরকারের কাছে কোনো অভিযোগ জানাতে চাই না, কাউকে বিব্রত করতে চাই না। শুধু বলতে চাই, তাঁদের আর্তনাদ ও মানবিক সংকটটি একটু অনুভব করুন। ফাইলের নথি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি মানুষের চোখের জল এবং পরিবারের অসহায়ত্বকেও গুরুত্ব দিন।
দ্রুত প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদনের মাধ্যমে ৭,৪০০ শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ৫০০-এর অধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনুন। বিশেষ করে ৮০ শতাংশ নারী শিক্ষকের মুখে হাসি ফোটানোর মানবিক উদ্যোগ গ্রহণ করুন।
শিক্ষকের মুখে হাসি ফিরুক, নারী শিক্ষকের মর্যাদা ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক, শিশুর শিক্ষার আলো অব্যাহত থাকুক।
মানবিকতার জয় হোক, শিক্ষার জয় হোক, নারীশক্তির জয় হোক।বিনীত আবেদনসহ, দীপক কুমার পালিত লেখক ও গবেষক আহ্বায়ক
বাংলাদেশ সংখ্যালঘু সম অধিকার কেন্দ্রীয় কমিটি, ঢাকা।