দীপক কুমার পালিত
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পুঁজিবাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও আর্থিক খাত। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারেনি। বাজারের উত্থান-পতন, আস্থার সংকট, অনিয়ম, কারসাজি এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি এই খাতে কর্মরত হাজার হাজার পেশাজীবীও অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
আমাদের পুঁজিবাজারে এমন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে লোকসানের মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অসাধু বাজার কারসাজিকারীদের কারণে। ফলে পুঁজিবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিদিন অত্যন্ত চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়।
বিশ্বের উন্নত পুঁজিবাজারগুলোতে ট্রেডার, ডিলার, ব্রোকার, পোর্টফোলিও ম্যানেজার ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপকদের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত নৈতিকতা এবং দায়িত্ব পালনের সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। আমাদের দেশেও এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে।
কেন একটি পৃথক নীতিমালা প্রয়োজন?
১. কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা: পুঁজিবাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চাকরির অনিশ্চয়তায় ভোগেন। তাঁদের চাকরি, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার সুরক্ষায় নীতিমালা প্রয়োজন।
২. অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন: পুঁজিবাজার একটি বিশেষায়িত শিল্প। এখানে অভিজ্ঞতা ছাড়া দায়িত্ব পালন করা কঠিন। তাই যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. পেশাগত প্রশিক্ষণ: ট্রেডার, ডিলার, পোর্টফোলিও ম্যানেজার, ব্রোকারেজ কর্মকর্তা এবং বিনিয়োগ পরামর্শকদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত সনদ চালু করা প্রয়োজন।
৪. মানসিক চাপ ও কর্মপরিবেশ: প্রতিদিন বাজারের ওঠানামা, বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, আর্থিক চাপ ও ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার মধ্যে কর্মীদের কাজ করতে হয়। তাঁদের জন্য একটি মানবিক ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
৫. বাজার কারসাজি প্রতিরোধ: যারা পরিকল্পিতভাবে বাজারকে প্রভাবিত করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি ও আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীকে অন্যের অনিয়মের দায় নির্বিচারে বহন করতে বাধ্য করা যাবে না।
সরকারের কাছে আমাদের প্রস্তাব
১. বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের তত্ত্বাবধানে পুঁজিবাজারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি পৃথক চাকরি ও পেশাগত আচরণবিধি প্রণয়ন।
২. পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন, উৎসব ভাতা, অবসর সুবিধা ও সামাজিক সুরক্ষার কাঠামো তৈরি।
৩. একটি স্বতন্ত্র বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট প্রফেশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও পেশাগত সনদ প্রদান করা হবে।
৪. বিশ্বের উন্নত পুঁজিবাজার—ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, জাপান ও অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের উপযোগী কর্মসংস্থান ও বাজার পরিচালনা নীতিমালা তৈরি।
৫. অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ব্রোকারেজ, মার্চেন্ট ব্যাংক, স্টক ডিলার, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট এবং বিনিয়োগ গবেষণা বিভাগ পরিচালনার ব্যবস্থা করা।
৬. পুঁজিবাজারের কর্মরত পেশাজীবীদের অধিকার ও সমস্যা নিয়ে একটি প্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় ফোরাম গঠন।
৭. বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান সংকটে পড়লে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর নীতিগত ব্যবস্থা গ্রহণ।
আমাদের প্রত্যাশা
আমরা চাই না শুধু পুঁজিবাজারের সূচক বাড়ুক। আমরা চাই একটি সুস্থ, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব পুঁজিবাজার গড়ে উঠুক। যেখানে বিনিয়োগকারীরা তাঁদের অর্থের নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার পাবেন, প্রতিষ্ঠানগুলো সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হবে এবং কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সম্মানের সঙ্গে তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।
একজন অভিজ্ঞ পুঁজিবাজারকর্মীর কয়েক দশকের অর্জিত জ্ঞান যেন একটি বাজারের সাময়িক সংকটের কারণে হারিয়ে না যায়। তাঁদের অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
পুঁজিবাজার শুধু শেয়ার কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি একটি বিশেষায়িত শিল্প, একটি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র এবং দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অতএব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের বিনীত আহ্বান—বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি যুগোপযোগী, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন করুন।
বিনিয়োগকারীর আস্থা, প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্ব এবং কর্মচারীদের নিরাপত্তা—এই তিনটির সমন্বয়েই গড়ে উঠুক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পুঁজিবাজার।
দীপক কুমার পালিত,পুঁজিবাজারের অভিজ্ঞ পেশাজীবী ও সমাজকর্মী।