মাহমুদুল হক আনসারী
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৃষ্টি করেছে। সাথে তার বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য উপাদানও তৈরি করেছেন। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ তার জীবন যাপন কিভাবে করবে সেটি তিনি মাপকাঠি করে দিয়েছেন। উৎপাদন কিভাবে করবে, সংরক্ষণ বাজারজাত সবকিছুতে একটা শৃঙ্খলা থাকার কথা। মানুষের মধ্যে সৃষ্টি ক্ষমতা, উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে। মানুষ পঞ্চ ইন্দ্রিয় একজন প্রাণী। ভালো মন্দ বিচার বিশ্লেষণ, সক্ষমতা মানুষকে সৃষ্টিকর্তা দিয়েছে। কিন্তু এই ক্ষমতাবলে মানুষ জাগতিক কিছু সাময়িক সুখ শান্তির জন্য প্রতারণা, ভেজাল, মিথ্যা এবং দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে।
বেঁচে থাকার জন্য মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীর খাদ্যগ্রহণের প্রয়োজন হয়। তবে সে খাদ্য হতে হবে নিরাপদ। যে খাদ্য ভক্ষণ বা পান করলে স্বাস্থ্য বা প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে, সে খাদ্য বা পানীয় বর্জনীয় এ পরামর্শ চিকিৎসকগণ দিয়ে থাকেন। ‘মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষার প্রধান পূর্বশর্ত ওষুধ বা প্রতিষেধক নয়, নিরাপদ খাদ্য’ এটাও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের অভিমত। এজন্য মানুষের চেষ্টা থাকে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণের।
কিন্তু নির্মম সত্যি হলো, আমাদের দেশে সে নিরাপদ খাদ্য ক্রমশ সোনার হরিণে পরিণত হচ্ছে। কারখানায় প্রস্তুতকৃত খাদ্য কিংবা খাদ্য উপাদান, নদী বা খামারের মাছ, জমির শাকসবজি কিংবা ফলমূল কোনো কিছুই আর মানুষের জন্য নিরাপদ থাকছে না।
ভেজাল ও নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে কারখানায় তৈরি হচ্ছে খাদ্য নামের অখাদ্য, মাছকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকর ফরমালিন, ফল পাকানো ও রঙ উজ্জ্বল করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে কার্বাইড। গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, খাদ্যদ্রব্যে এসব রাসায়নিকের ব্যবহার মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে মানুষ নানারকম জটিল ও কঠিন রোগব্যাধিÑ এমনকি ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে।
এসব কথা আমরা সবাই কমবেশি জানি এবং এ নিয়ে কথা চালাচালি, লেখালেখি কম হয়নি। কিন্তু এইসব বিষয়ে প্রতিনিয়ত লেখালেখি হচ্ছে। তারপরেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। কথা আর লেখা পড়ে রয়েছে কাগজে। অপরদিকে খাদ্যপণ্যে ভেজালের দৌরাত্ম্য চলছে অব্যাহত গতিতে। সবকিছুর তথ্য উপাত্ত জানা থাকলেও ওইসব খাদ্য নামের অখাদ্য-কুখাদ্য ভক্ষণ করছে মানুষ নামের প্রাণী।
মানুষ বেঁচে থাকার জন্যে খাচ্ছে, খাওয়াচ্ছে। কি খাচ্ছি কি খাওয়াচ্ছে সেটি নিয়ে মানুষ মনে হয় ভাবছিনা। পত্রিকার পাতা উল্টালেই খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ার নানাবিধ প্রতিবেদন চোখে পড়লেই মানুষ শিউরে ওঠে। কিন্তু এইসবের বিরুদ্ধে বাস্তব প্রতিকার জনগন দেখছে না।
ভেজালের দৌরাত্ম্যে জনগন বেঁচে থাকার জন্য নির্ভেজাল ও নিরাপদ খাদ্য পাওয়া এখন দুষ্কর হয়ে পড়েছে। মানুষের জন্য ভেজালমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে যে তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তারা যে কার্যত ব্যার্থ হচ্ছে সেটিও জনগন দেখতে পাচ্ছে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই), ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বছরব্যাপী বহু সংখ্যক অভিযান চালিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। সরকার এই সংস্থাসমূহকে কার্যকরণ পরিচালনার জন্য যথেষ্ট সহযোগিতা দিয়ে থাকে। তাদের অফিস, জনবল, কার্যক্রম সবকিছু দেখা যায়। বাস্তবে সুফল পাচ্ছে না জনগন।
সরকারি এতসব সংস্থা এবং তাদের ‘কঠোর নজরদারি’ থাকা সত্তে¡ও খাদ্যে ভেজালদান কিংবা জনস্বাস্থ্যহানিকর নিম্নমানের খাদ্যপণ্য উৎপাদন-বিপণন কেন বন্ধ হচ্ছে না এই যেন একটি কঠিন প্রশ্ন।
উন্নত দেশগুলোতে খাদ্য কিংবা ব্যবহার্য পণ্যের মধ্যে ‘পিওর’ বা খাঁটি বলে আলাদা কিছু নেই এমন একটি কথা প্রচলিত আছে। সেসব দেশে খাদ্যপণ্য কিংবা প্রাণরক্ষাকারী ওষুধের একটিই ধরন মানুষের ব্যবহারোপযোগী ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। ওরা মানুষ, এমনকি পশুখাদ্যেও ভেজাল দেওয়ার কথা চিন্তাও করে না।
এই ক্ষেত্রে আইনের ভয় যেমন রয়েছে, তেমনি তাদের মধ্যে জাগ্রত রয়েছে বিবেক। কিন্তু আমাদের দেশে এ দুটোর অভাবই প্রকট। এখানে আইন থাকলেও আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। অন্যদিকে একশ্রেণির মানুষের মগজে-মননে বিবেক বলে কোনো বোধের অস্তিত্ব নেই। ফলে এখানে বাধাহীনভাবে চলে ভেজালের মহোৎসব।
সচেতন ব্যক্তিরা শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন। যেভাবে অনৈতিকতা, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তপনার বিস্তার ঘটছে, যদি দ্রুত এর লাগাম টেনে ধরা না হয়, তাহলে এ সমাজ অচিরেই মনুষ্য বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে; যেখানে দুর্নীতি হবে ‘নীতি’ আর অনিয়ম হবে ‘নিয়ম’। খাদ্যে ভেজাল এবং অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করাও দুর্নীতির অন্যতম অংশ। সরকার মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন সেটি জনগন বিশ্বাস রাখে। কিন্তু সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন জনগন বাজার, মার্কেটে, দোকানে দেখতে পাচ্ছে না। ভেজাল ভেজাল খাদ্যে সয়লাভ দোকান মার্কেট এইসব খাদ্যপণ্যের পেকেটে বিএসটিআই এর লগো দেখা যায়। মারাত্মক পরিস্থিতি দেখা যায় শিশু খাদ্যের পণ্যে। কোমলমতি শিশুদেরকে নামিদামি প্যাকেটজাত করে কি খাওয়াচ্ছে, আমরা কি কিনে খাওয়াচ্ছি সেটিও পরিক্ষা করে দেখছিনা। ফলে শিশুর শারিরীক, মানসিক মেধা সবকিছুর মারাত্মকভাবে ক্ষতি হচ্ছে। একদিকে সকল পণ্যের উর্ধ্বমূল্য, অপরদিকে মানহীন ভেজাল পণ্য। বাস্তবে এইসব ভেজাল দুর্বল খাদ্যপণ্যের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের কি পদক্ষেপ থাকবে সেটিও আমরা বলতে পারছি না। খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, বাজারজাত ও গ্রহণের নিয়মনীতি ভেজাল প্রতিরোধ রক্ষায় সরকারের কঠোর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে জনগন।