মাহমুদুল হক আনসারী
জাতীয় ঐক্য কোনো বিলাসিতা নয়, এটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার পূর্বশর্ত। একটি জাতি যদি বিভক্ত হয়ে পড়ে, তবে তার শক্তি নিঃশেষ হতে শুরু করে। আত্মপরিচয় বিলুপ্ত হয় এবং একসময় রাষ্ট্রব্যবস্থাও ধসে পড়ে। সুতরাং জাতীয় ঐক্য একটি মহাশক্তির নাম, যা বিচ্ছিন্ন হৃদয়গুলোকে এক সুতায় গেঁথে দেয়, জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় অবিচল ছায়া হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে সংকট মনে হয়, আবার ঘণীভূত হতে দেখা যাচ্ছে। সরকারী দল, বিরোধী দল তারা একে অপরের প্রতি আস্তা এবং বিশ্বাস রাখতে পারছে না। ২৮ আগস্ট জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে তুমুলভাবে বাক বিতন্ডা দেখা যায়। সংসদীয় গণতন্ত্রের শিষ্টাচার সেখানে অনুপস্থিত ছিল। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রিকে বক্তব্য রাখতে কয়েকবার বাধা প্রদানে হট্টগোল সৃষ্টি করেছে। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যগণ। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সংসদের দাবি করা হচ্ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রম অবনতি সম্পর্কে। সংসদ সদস্য এবং দেশের জনগনের জানমালের নিরাপত্তার শৃঙ্খলা সরকার দিতে ব্যর্থ হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, মাদকপাচারের ভয়াবহতাসহ নানা বিষয়ে বিরোধীদল এবং সরকারিদল সেখানে তুমুলভাবে বেশকিছু সময় হট্টগোলের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিস্থিতিকে একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশের তৈরি করে। স্পিকার বার বার বিরোধী দলকে সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করার আহন করলেও সে আহবান রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বিরোধী দল শেষ পর্যন্ত সংসদ বয়কট করেছে।
কথা হচ্ছে জাতীয় সংসদে আলোচনা হবে, বক্তব্য হবে, একদল আরেকদলকে মার্জিত ভাষায় সম্বোদন করবে। এটি সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য অলংকার। কেন জানি এই সংসদের শুরু থেকে সেটি জাতি দেখতে পাচ্ছে না। ফলে আশাঙ্কা ও নতুন করে সংকট দেখছে জাতীয় রাজনীতিতে। জাতীয় ঐক্য যদি আবার বিনষ্ট হয়, আগামীর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গভীর ভাবে সংকট তৈরি করবে।
ইসলামের মৌলিক দর্শনে জাতীয় ঐক্য শুধু রাজনৈতিক প্রয়োজনে নয়, বরং তা ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচিত। কারণ ইসলাম শুধু ব্যক্তির নৈতিকতা কিংবা ইবাদতের পথ প্রদর্শক নয়, বরং সৌহার্দ্যপূর্ণ সামজিক কাঠামো গড়ারও বিস্তৃত দিকনির্দেশনা। এই নির্দেশনার অন্যতম স্তম্ভ হলো জাতীয় ঐক্য।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০৩)
এই আয়াতে ‘আল্লাহর রজ্জু’ বলতে বোঝানো হয়েছে কোরআন, সুন্নাহ ও আল্লাহর বিধান। এটি শুধু ধর্মীয় নির্দেশনা নয়, বরং একটি জাতিকে কীভাবে সংহত ও সুসংবদ্ধ রাখা যায় তার মৌলিক ভিত্তি। ঐক্যহীনতা মানেই অস্থিরতা, দুর্বলতা এবং ধ্বংসের দিকে যাত্রা।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন পবিত্র মদিনায় হিজরত করেন, তখন তিনি প্রথমেই মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করেন।
তারপর ‘মদিনা সনদ’ প্রণয়ন করে বহুজাতিক সমাজে শান্তি ও সংহতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। যা ছিল ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান; যেখানে মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও নিরাপত্তা রক্ষার অঙ্গীকার ছিল। ঐক্য ভঙ্গের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, কোরআনুল কারিমে সে ব্যাপারে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলা হয়েছে- ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা সুস্পষ্ট নিদর্শন আসার পরেও বিভক্ত ও মতভেদে লিপ্ত হয়েছিল।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০৫)
ইসলাম গোত্রগত অহংকার, সাম্প্রদায়িক গোঁড়ামি এবং দলগত বৈষম্যের ঘোরতর বিরোধী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জাতিগত গর্বে আহŸান জানায়, সে-ই উগ্রতায় লড়াই করে বা তাতে নিহত হয়, সে জাহিলি যুগের মৃত্যুবরণ করল।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৮৫০)।
এই হাদিস শুধু তৎকালীন আরব গোত্রীয় বিভাজনের নিন্দা নয়, বরং সব যুগের বিভাজনকারী রাজনীতি ও উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রতি এক চিরন্তন প্রতিবাদ।
আধুনিক বিশ্বে মুসলিম উম্মাহর বিপর্যয়ের পেছনে অন্যতম কারণ অব্যাহত অনৈক্য। রাজনৈতিক মতভেদ, মতবিরোধপূর্ণ দলাদলি ও কৌশলগত বিভাজনই মুসলিম জাতিকে শক্তিহীন ও পরনির্ভর করে দিচ্ছে। অথচ রাসুল (সা.) বলেন, ‘এক মুসলিম আরেক মুসলিমের জন্য একটি দালানের মতো, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্ত করে ধরে।’ (বুখারি শরীফ, হাদিস : ৪৮১)
ঐক্যের সৌন্দর্য্য ও শক্তি ফুটে ওঠে মুসলমানদের প্রথম যুগের ইতিহাসে। খিলাফতে রাশেদা, উমাইয়া, আব্বাসিয়া ও উসমানিয়া খিলাফতের বিস্তৃতি, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশ এ কথাই প্রমাণ করে যে ঐক্য থাকলে বিজয় আসে, উন্নয়ন ঘটে, সভ্যতা গড়ে ওঠে।
আজ বাংলাদেশসহ বিশ্ব মুসলিম সমাজে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজনের যে ভয়াবহ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে-তা শুধু আত্মঘাতী নয়, বরং ইসলামী মূল্যবোধের বিরুদ্ধেও এক মারাত্মক অমান্যতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির দৃষ্টান্ত একটি দেহের মতো; দেহের একটি অঙ্গ ব্যথিত হলে সারা দেহ জেগে ওঠে জ্বরে ও কষ্টে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৬)
এমন শিক্ষা একমাত্র ইসলামই দিতে পারে, যা জাতিকে জাতিতে, হৃদয়কে হৃদয়ে এবং রাষ্ট্রকে সমাজে রূপান্তর করে দেয়। জাতীয় ঐক্য রক্ষা করা শুধু কৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি ইমানের দাবি, এটি ইসলামী সভ্যতার আত্মা। এই ঐক্য ছাড়া যেমন উন্নয়ন অসম্ভব, তেমনি রক্ষা করা যায় না স্বাধীনতা কিংবা সংস্কৃতি। ইসলাম আমাদেরকে শিক্ষা দেয় ঐক্য, শৃঙ্খলা, ভ্রাত্বিত্ত, সহমত পোষণ করা। গোত্রে গোত্রে, ভাইয়ে ভাইয়ে, এলাকায় এলাকায়, নিজদের মধ্যে বিভক্ত না হওয়া। অন্যমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। দ্বীমত পোষণকারী ব্যাক্তি গোষ্টি দলের প্রতি আক্রমণাত্তক না হওয়া। ইসলামী ঐক্য ভ্রাত্বিত্ত বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে মুসলিম সমাজ হতে একে অপরের প্রতি কাদা ছুড়াছুড়ি না করা।
জাতীয় এবং ইসলামী মৌলিক বিষয়ে পরিবার থেকে সমাজ রাষ্ট্র পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ থাকার শিক্ষা দেয় ইসলাম। নবী মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর অগণিত বাণীর মাধ্যমে উম্মতদের ঐক্য এবং ভ্রাত্বিত্ত রক্ষা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলাম শিক্ষা দেয় জাতীয় ও মুসলিম ঐক্য তৈরি করার জন্য। ঐক্য ধ্বংস করা, ঐক্য বিরোধি বিভক্তি সৃষ্টি করা ইসলামের আলোকে বড় অপরাধ। ইসলাম মুসলিম ও জাতীয় জীবনে ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের গুরুত্তারোপ করেছেন।
বর্তমান সমাজে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্র্মীয় প্লাটফর্মে যেভাবে বিতর্ক, কাদা ছোড়াছোড়ি, হামলা পালটা হামলা এইসব চরিত্র কোনো ভাবেই জাতীয় ও ইসলামী ঐক্যের জন্য সহায়ক নয়। ইসলাম এবং জাতীয় ঐক্য, জাতীয় শৃঙ্খলা সংবৃদ্ধি, স্থিতিশীল পরিবেশ যারা প্রত্যাশা করে, তাদের উচিত হবে জাতীয় ঐক্য বিদ্ধংসি কর্মকান্ড, কর্মসূচী থেকে বিরত থাকা। ইসলামি জীবন বিধান প্রতিষ্ঠায় ইসলাম ভিত্তিক ধর্মীয় ছোটবড় সব সংঘটনগুলোকে জাতীয় ঐক্যবিরোধি কর্মসূচী পরিহার করে নিজেদের মধ্যে দূরত্ব না রেখে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা দরকার। ইসলামসহ অপরাপর দলের মতের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মতের গ্রæপ থাকতে পারে। সেই জন্য বৃহত্তর জাতীয় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐক্য ধ্বংস করা মানেই হলো নিশ্চিত সবার জন্য পরাজয়। আসুন দেশ, জাতির বৃহত্তর ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সম্মিলিত প্রচেষ্টা গড়ে তুলি।