
যুক্তরাজ্য থেকে দুবাইয়ে অর্থ স্থানান্তর, এনবিআরের একটি চক্রের বিরুদ্ধে ধামাচাপা দেয়ার পায়তারা
দেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং জাহাজ ভাঙা শিল্পের আলোচিত ব্যবসায়ী মো. শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে স্থানান্তরের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাজ্য থেকে ইউনাইটেড ব্যাংক অব সুইজারল্যান্ড (ইউবিএস)-এর মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল এই অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে।
গোয়েন্দা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)-কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছে। বিদেশি কর্তৃপক্ষের পাঠানো ওই চিঠিতে অর্থ স্থানান্তরের উৎস, লেনদেনের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে ঘটনার আরও উদ্বেগজনক দিক হলো, এনবিআরের একটি প্রভাবশালী চক্র পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, বিদেশি সংস্থার পাঠানো তথ্য যাতে পূর্ণাঙ্গ তদন্তে রূপ না নেয়, সে জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে।
অর্থপাচারবিরোধী আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের অভিযোগ কোনো সাধারণ আর্থিক লেনদেন নয়। অর্থের উৎস, কর পরিশোধের অবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন অনুসরণ করা হয়েছে কিনা এবং অর্থটি বৈধ ব্যবসায়িক কার্যক্রমের অংশ ছিল কিনা তাদের মতে, অভিযোগের সত্যতা মিললে এটি অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন এবং কর ফাঁকি-সংক্রান্ত একাধিক আইনের সম্ভাব্য লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সূত্রগুলো বলছে, বিদেশি কর্তৃপক্ষের পাঠানো অনুসন্ধানপত্র এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে অস্বাভাবিক নীরবতা বিরাজ করছে। অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি প্রকাশ্যে না আসার জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে তদন্ত প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার চেষ্টা চলছে।
এছাড়া চট্টগ্রামভিত্তিক কয়েকজন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিও বিষয়টি মীমাংসার জন্য সক্রিয় রয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো সরকারি নথি বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে শওকত আলী চৌধুরীর মালিকানাধীন বলে দাবি করা এস এন কর্পোরেশন কর্তৃক আমদানিকৃত একটি জাহাজ নিয়েও নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জাহাজটি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত এবং বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করছে।
সামুদ্রিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাভুক্ত কোনো জাহাজ দেশের বন্দরে প্রবেশ বা অবস্থান করলে তার মালিকানা, পূর্ববর্তী কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের বিষয়গুলো গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অন্যথায় তা দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ভাবমূর্তি এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ, তদন্তে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এবং নিষেধাজ্ঞা-সংশ্লিষ্ট জাহাজ বিতর্ক সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন জাতীয় গুরুত্বের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, অভিযোগগুলো সত্য। হলে দেশের আর্থিক খাত, কর প্রশাসন এবং সুশাসনের জন্য এটি একটি বড় ধরনের সতর্কসংকেত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের পিআরও শাখায় জিউল করিমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।সুত্রঃএনএনবি