বিশেষ প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি – রাঙ্গামাটি মহাসড়ক দিয়ে হাজার হাজার ঘনফুট অবৈধ কাঠ পাচারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগীতা করে প্রতি মাসে বিপুল টাকা ঘুষ বাণিজ্য করছে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন হাটহাজারী চেক স্টেশন। এই ষ্টেশন দিয়ে কাঠ পাচার প্রতিরোধের পরিবর্তে প্রতিদিন অবৈধ কাঠ পরিবহনের সহযোগি এই ষ্টেশন বড় কর্তা থেকে কর্মরত সবাই । এই কাঠ পাচারে সহযোগিতার বিনিময়ে দৈনিক ঘুষ আদায় হয় ১ থেকে দেড় লাখ টাকা ।
হাটহাজারী চেক স্টেশন কর্মকর্তা লুৎফুর রহমানের তত্ত্বাবধানে কাঠ পাচারে ঘুষ বাণিজ্য এখানে ওপেন সিক্রেট। জানা গেছে, ডিএফও এসিএফসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদায়কৃত ঘুষের একটি অংশ পৌঁছে দেয় বলে তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে ।
আমাদের অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও ফটিকছড়ি বন অঞ্চল থেকে যেসব কাঠবাহী ট্রাক কাভার্ডভ্যান চট্টগ্রামে উদ্দেশ্যে যায় সেসব ট্রাক ট্রানজিট পাশ (টিপি) বা কাঠ পরিবহনের বৈধ অনুমতি আছে কি-না তা চেকিং-এর জন্য থামানো হয় হাটহাজারী ১১ মাইলস্থ হাটহাজারী চেক স্টেশনে। এই স্টেশনে চেকিংকালে যেসব কাঠের বৈধ ট্রানজিট পাশ থাকে সেগুলো থেকে প্রতি ট্রাকে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা এবং যেসব ট্রাকের কাঠ সম্পূর্ণ অবৈধ বা কোনো ট্রানজিট পাশ থাকে না সেগুলো থেকে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করে ছেড়ে দেয়া হয়। ঘুষের লেনদেনে হেরফের হলেই মাঝে মধ্যে স্টেশনে কিছু কাঠ আটক দেখান এই কর্মকর্তারা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বৈধ ট্রানজিট পাশ থাকলেও ঘুষ দিতে হয়, পাশ না থাকলে দিতে হয় কয়েকগুণ বেশি । আর এই সুযোগে কাঠ ব্যবসায়ীরা বন বিভাগকে ২০০ থেকে ২৫০ ঘনফুট কাঠে রাজস্ব দিয়ে পরিবহন করেন ৫০০ থেকে ৬০০ ঘনফুট কাঠ। ফলে বৈধ কাঠ পরিবহনের আড়ালে অবৈধ কাঠ পাচার করলেও ঘুষ নিয়ে চুপ থাকেন সংশ্লিষ্ট চেক পোস্টের কর্মকর্তারা। জানা গেছে, চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে অত্যন্ত লোভনীয় পোস্টিং হিসেবে খ্যাত এই হাটহাজারী চেক স্টেশন।
এক কাঠ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘খাগড়াছড়ি থেকে বৈধ ট্রানজিট পাশ নিয়ে হাটহাজারী চেক স্টেশনে প্রতি ট্রাকে ৩,২০০ টাকা করে ঘুষ দিতে হয়। এটা এখানে একদম ওপেন সিক্রেট ।
দেখা গেছে, লাখ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে এসব স্টেশনে পোস্টিং নেন স্টেশন কর্মকর্তারা। সেই টাকা আদায় করতে প্রকাশ্যে কাঠ পাচারে সহায়তা করে ঘুষ বাণিজ্য চালান তারা।
সুত্রমতে খাগড়াছড়ি, ফটিকছড়ি ও রাঙ্গামাটি অঞ্চল থেকে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০টি গাড়ি কাঠ, জ্বালানি কাঠ, বাঁশ ও অন্যান্য বনজদ্রব্য নিয়ে হাটহাজারী চেক স্টেশন অতিক্রম করে। সেসব গাড়ি থেকে প্রতিদিন ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় হয়। মূলত হাটহাজারী চেক স্টেশন কর্মকর্তা ফরেস্টার লুৎফুর রহমান এই ঘুষ আদায় করেন প্রকাশ্যেই।
আমাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লুৎফুর রহমান করের হাট রেঞ্জের হেয়াকো বীট কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় সরকারী লটের কাঠ, বাগানের খাড়া গাছ, টাকার বিনিময়ে বনভুমিতে অবৈধ ঘর স্থাপনে সহায়তা, বনভুমি বিক্রিসহ বিভিন্ন অপরাধের দায়ে তাকে ক্লোজ করে বিভাগীয় দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। জানা গেছে, বিভাগীয় কর্মকর্তাকে অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে রাজী করিয়ে হাটহাজারী বীট কাম চেক স্টেশনে যোগদান করেন। এরপর লুৎফুর রহমান আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেন । এর আগে তিনি কক্সবাজার দক্ষিণ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তখনো তার বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ রয়েছে।
হাটহাজারী স্টেশন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, স্টেশনে পোস্টিং নিয়ে বড় অংকের টাকা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ঘুষ দিতে হয়। এক বছর মেয়াদের পোস্টিংয়ে এক বছরের মধ্যেই লাভ সমেত ঘুষের টাকা তুলে নিতে হয়। তাই এখানে টিপি চেকিং বাবদ নির্দিষ্ট অংকের অর্থ আদায় অলিখিত নিয়ম।
স্টেশনে এক বছরের জন্য পোস্টিং পেতে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। সেই টাকা আদায় করতেই মূলত অবৈধ কাঠ পাচারে সহযোগিতা করতে হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্টেশন কর্মকর্তা লুৎফুর রহমান বলেন আমি এখন গাড়ীতে । আপনার কি নাম ? চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে আমার কয়েকজন সাংবাদিক পরিচয় আছে। আমি সহকারী রেঞ্জার । আমার রেঞ্জ কর্মকর্তা হলেন সাইফুল ইসলাম । সাইফুল ইসলাম সাহেবের মোবাইল নাম্বার চাইলে তিনি বলেন এটি আমার মুখস্থ নেই। নিউজের বিষয়ে কোন বক্তব্য না দিয়ে তিনি ফোন কেটে দেন।