আশরাফ উদ্দিন
২৯ জুলাই শুক্রবার মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরণা রোড়ে রেল ক্রসিং এ ঘটে গেল ভয়াবহ দূর্ঘটনা। দূর্ঘটনায় ১১ পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সারাদেশে। শোকের মাতম বইছে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আমান বাজার সহ সারা চট্টগ্রামে। স্বজনরা বুকে পাথর চাপা দিয়ে নিহতদের দাফন সম্পন্ন করলেও আহত ৬ জন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে আহতদের মধ্যে দুই জনের অবস্থা খুবই নাজুক। যে কোন সময় তাদের মৃত্যু হতে পারে।
দূর্ঘটনার পর সচতেন মহলে আলোচনা সমালোচলার ঝড় উঠেছে। কার দোষ কতটুকু তা খুঁজে বের করে দোষত্রুটির পক্ষে বিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করছেন অনেকেই। তারই ধারাবাহিকতায় মিরসরাইয়ের সাংবাদিক আশরাফ শনিবার (৩০ জুন) সকালে দূর্ঘটনার স্থল পরিদর্শন করে ক্রসিং এলাকার অসংঘতি গুলো শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। তার সরজমিন পরিদর্শনে চোখে পড়ে রেল আসার আগ মূহর্তে যে সিগন্যাল লাইট জ্বলার কথা তা জ্বলছে না। ট্রেন আসার পূর্ব থেকে যে সর্তকতা বেল বাজার কথা সেটিও বাজে না। এমনকি ট্রেন এক ষ্টেশন থেকে অন্য ষ্টেশনে যাওয়ার তথ্য যে টেলিফোনের মাধ্যমে ষ্টেশন মাষ্টার বা রেলক্রসিং গেইট ম্যানকে জানানো হবে সেটিও বিকল। গেইট ম্যানের কক্ষে যে সিষ্টেম আছে সেটির সুইচ ঘুরালে একটি লাল ও একটি সবুজ বাতি জ্বলছে সেই সাথে সাথে বাহিরের সাংকেতিক লাল ও সবুজ বাতি জ্বলার কথা কিন্তু বাস্তবে তা জ্বলছে না। সর্বপোরি বলতে গেলে বিতর্কিত এই রেল ক্রসিংএর যাবতীয় সিষ্টেম ছিল বিকল। একটি প্রকল্পের কেজুয়াল কর্মচারী সাদ্দাম হোসেনকে নামকা ওয়াস্তে গেইট ম্যান হিসেবে বসিয়ে দিয়ে দায় সেরেছে রেল কর্তৃপক্ষ। স্থানিয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, গেইটম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সাদ্দাম ট্রেইন আসার তথ্য আগ থেকে পান না। ট্রেন আসছে নিজ থেকে যখন বুঝতেন তখনি গেইট বার ফেলতেন। তবে গেইট বার ফেলতে গেলেও ক্রসিং পার হওয়া অনেক পর্যটকের সাথে বাক বিতন্ডা হতো তার। ট্রেন দূরে থাকা অবস্থায় গেইটবার ফেলতে গেলে বাধা হয়ে দাড়াতো অনেক পর্যটক। গেইটবার তুলেও পর্যটকদের গাড়ি ঝুকি নিয়ে চলাচল করতো।
গেইটম্যান সাদ্দামের বিরুদ্ধে দায় সাড়া মামলা রেল কর্তৃপক্ষ। রেল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলা যেখানে মুখ্য ভূমিকা হয়ে দাড়িয়েছে সেখানে নিজেদের দায় এড়াতে গেইটম্যান সাদ্দামের নামে মামলা করাটা যেন উদোর পিন্ডি ভুধোর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা বলে মনে করছেন অনেকে। কারন হিসেবে স্থানীয়রা জানান, রেল কর্তপক্ষের সিষ্টেম বিকল থাকার কারণে সাদ্দাম জানতোনা জুমার নামাজের সময় ট্রেন আসবে। তার কাছে ছিলনা কোন তথ্য। আর যেহেতু জুমার নামাজের সময় ক্রসিং এ গাড়ি পারাপার থাকেনা তাই সেই সুযোগে নামাজ পড়তে চলে যান তিনি। কিন্তু দূর্ভাগ্য বশত সেই মুহর্তেই ঘটে ভয়াবহ দূর্ঘটনা।
পর্যটকদের উদাসীনতা, ড্রাইভারের অসচেতনতা
উদাসীন পর্যটকদের অসচেতনতাকে ও দূর্ঘটনার অন্যতম কারণ মনে করছেন অনেকে। স্থানীয় কামাল হোসেন জানান, পর্যটকদের গাড়ি পূর্বদিক থেকে রেল ক্রসিংএর উপর উঠে যায়। কিন্তু পূর্বদিক থেকে যে রাস্তা হয়ে পর্যটকের গাড়ি এসেছে সেই রাস্তার ৮শ গজ দূর থেকে ট্রেনের চলাচল খুবই স্পষ্ট ভাবে অনেক আগ থেকে দেখা যায়। এত দূর থেকে ট্রেনের চলাচল দেখা গেলেও পর্যটকদের বহন করা গাড়িটি কোন কারনে ট্রেনের চলাচল দেখতে পায়নি তা প্রশ্ন জাগে। স্থানীয় অনেকেই মন্তব্য করেন, ছোট্ট একটি মাইক্রো গাড়িতে গাদাগাদী করে ১৮জন পর্যটক বহন করা হয়েছে। এছাড়া গাড়িতে উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে আনন্দ করার সময় গাড়ির ড্রাইভারের মনযোগ সেই দিকে থাকায় ট্রেন চলে আসার বিষয়টি নজরে পড়েনি। ফলে দ্রুত গতীতেই রেল লাইনের উপর উঠে পড়ে গাড়ি। এতেই নিমিষে নিঃশেষ হয়ে যায় ১১টি তাজা প্রাণ। এমন দূর্ঘটনায় পর্যটকের গাড়ির ড্রাইভারের অসচেতনতা ও পর্যটকদের উদাসীনতা কোন অংশে কম নয়।
বিষয়গুলি নিয়ে জানতে চাইলে রেলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, গেইটম্যান আমাদের নিয়োগ প্রাপ্ত মাষ্টাররোলের কর্মচারী। ঘটনার দিন চট্রগাম থেকে ছেড়ে যাওয়া মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ১টা ৩২ মিনিটে বড়তাকিয়া স্টেশন পার হয়। বড়তাকিয়া স্টেশন পার হওয়ার ৫ মিনিট অর্থাৎ ১টা ২৭ মিনিটে গেইটম্যান গেইবার ফেলে। সেই গেইটবার আর তোলা হয়নি কারন ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা মহানগর প্রভাতি ট্রেনটি ১টা ৩৫মিনিটে বড়তাকিয়া স্টেশন ত্যাগ করে। কিন্তু অধৈর্য পর্যটকরা প্রথম ট্রেনটি পার হওয়ার সাথে সাথে গেইটবার তুলে রেল ক্রসিং পার হওয়ার চেষ্টা করলে দূর্ঘটনার কবলে পড়ে। সিগন্যাল সিসটেম বিকল থাকা রেলওয়ের অব্যাবস্থাপনা ইঙ্গিত করেকিনা সেটি জানতে চাইলে তিনি জানান, এটি দুদিন আগেও ঠিক ছিল। এই সম্পর্কে সাংবাদিককে আক্রমন করে তিনি বলেন আপনি কত দিন সংবাদিকতা করেন আমি জানি না। আপনার জানা প্রয়োজন ইলেকট্রনিক জিনিস যে কোন মূহর্তে নষ্ট হতে পারে। টেলিফোন বিকল থাকার ব্যাপারে তিনি জানান, টেলিফোনে নয় বরং মোবাইলে স্টেশন মাষ্টার গেইটম্যানকে তথ্য প্রদান করে। গেইট ম্যানের বিরুদ্ধে মামলার ব্যাপারে তিনি বলেন, তার ব্যাপারে কেন মামলা করা হয়েছে আমি জানিনা। তার কোন দোষ আমি দেখিনা। তাকে বার বার আমি জিজ্ঞাসা করেছি সে গেইট ফেলার কথা আমার কাছে স্বীকার করেছে। তার দ্বয়িত্বে অবহেলা ছিলনা। তবু দেখা যাক তদন্ত কমিটি কে প্রতিবেদন দাখিল করে তার উপর অন্যান্য বিষয়গুলি নির্বর করবে।