মো. কামাল উদ্দিন
পৃথিবীতে এমন কিছু সাংবাদিক আছেন, যারা আজীবন আপোষহীন থেকে সত্য বলার অদম্য সাহস প্রদর্শন করেছেন। তারা লিখেছেন, কথা বলেছেন, এমনকি সমস্ত ভয়, হুমকি বা প্রলোভনের মুখেও দমে যাননি। শক্তিশালী সরকারী শাসন, রাজনৈতিক চাপ বা ব্যক্তিগত সুবিধা কখনো তাদের সত্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। এই সাংবাদিকরা শুধু খবর সংগ্রহ করেননি; তারা জনগণের জন্য সত্যের রক্ষাকবচ, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলসভাবে লড়েছেন।
একজন আন্তর্জাতিক উদাহরণ হলো Maria Ressa, ফিলিপাইন্সের এই সাংবাদিক তার জীবনের প্রতিটি ধাপে সত্যকে বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি সরকারের সমালোচনা করেছেন, মানবাধিকারের লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন, এবং সাংবাদিকতার জন্য বহু মামলা-মোকদ্দমার মুখোমুখি হয়েছেন। তবু কখনো দুর্বল হননি, কখনো স্বার্থসিদ্ধির পথ অবলম্বন করেননি। Maria Ressa ২০২১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেছেন। তার জীবন প্রমাণ করে—সত্যের পথে দাঁড়ানো কখনো ব্যর্থ হয় না। Maria Ressa-এর মতো সাহসী সাংবাদিকের তালিকায় আরও আছেন ক্যামেরুনের Pius Njawé, বেলারুসের Svetlana Kalinkina, পাকিস্তানের Ahfaz‑ur‑Rahman। এরা সবাই সরকারী অত্যাচার, সন্ত্রাসবাদী হুমকি এবং রাজনৈতিক প্রলোভনের মুখেও দাঁড়িয়েছেন, মানুষের স্বাধীনতা এবং সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অধিকার রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের সাহস, দৃঢ়তা এবং সত্য বলার অদম্য মনোবল আমাদের শেখায়—সত্য বলার সাহসই প্রকৃত সাংবাদিকতার মহিমান্বিত পরিচয়।
বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে এই সাহস ও আপোষহীনতার এক উজ্জ্বল প্রতিভূ ছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। তিনি চারটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক, এবং “লাভ বাংলাদেশ” নামের একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। আজীবন তিনি সরকারের মূল শাসনের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন, লিখেছেন, কথা বলেছেন এবং কখনো দুর্বল হননি। সুযোগের মুখে স্বার্থসিদ্ধির পথ অবলম্বন করেননি, বরং দেশের স্বার্থ ও জনগণের অধিকার রক্ষায় প্রতিটি পদক্ষেপে অবিচল থাকতেন।
মিজানুর রহমান চৌধুরীর সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি একটি নৈতিক যুদ্ধ, এক সামাজিক দায়িত্ব, এবং দেশের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতীক। তার সাহিত্যিক ভাষা, বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন এবং প্রমাণভিত্তিক খবরে তিনি আজকের সাংবাদিক সমাজের এক অনন্য আইডল। তার কর্মসংস্কৃতি এবং আপোষহীন নৈতিকতা শিক্ষণীয়, যা নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের পথপ্রদর্শক। বিশ্বমানের সাংবাদিক হিসাবে মিজানুর রহমান চৌধুরীর কীর্তি বাংলাদেশের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে। তার অভিজ্ঞতা ও কাজ দেশে বিদেশে গবেষণার যোগ্য। আমি যেসব দেশে গিয়েছি, সেখানে সাংবাদিকতা, মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতা রক্ষায় অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সমাজে উদাহরণস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে মিজানুর রহমান চৌধুরী। তাতে তিনি প্রমাণ করেছেন—সত্য বলার সাহস, নৈতিক দৃঢ়তা এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আন্তর্জাতিক মানের সাংবাদিকতার পরিচয়। মিজানুর রহমান চৌধুরীর জীবনের অন্যতম বিশেষ দিক হলো, তিনি কখনো রাজনৈতিক প্রলোভন, অর্থনৈতিক সুবিধা বা সামাজিক চাপের কাছে নত হননি। তিনি বুঝতেন—সাংবাদিকতার সত্যিকারের মর্যাদা হল মানুষের জন্য দাঁড়ানো, সরকারের বা ক্ষমতাশালী শক্তির নয়। তার এই মনোবল এবং সৎ চরিত্র আজকের সাংবাদিক সমাজকে অনুপ্রাণিত করছে। তার সাহসী পদক্ষেপের উদাহরণ অসংখ্য: সাংবাদিকতা ও সমাজচিন্তা: সরকারের বিতর্কিত নীতি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিরলস প্রতিবেদন প্রকাশ।প্রকাশনা ও সম্পাদকীয় দায়িত্ব: চারটি পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে সর্বদা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কাজ।সামাজিক সংগঠন ও মানবিক উদ্যোগ: “লাভ বাংলাদেশ” প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা ও সেবামূলক উদ্যোগ।আন্তর্জাতিক গবেষণার যোগ্যতা:
আজকের সময়ে সাংবাদিকতার দুনিয়ায় ভুয়া সাংবাদিকদের সংখ্যাই বেড়ে গেছে। তারা প্রকৃত সাংবাদিকদেরকে অবমূল্যায়ন করতে চেষ্টা করছে। কিন্তু মিজানুর রহমান চৌধুরী সেই সমস্ত তথাকথিত নামসর্বস্ব সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আজও সাহসের সঙ্গে লড়াই করছেন। তার লেখনী মাফিয়া, দালাল এবং স্বার্থান্বেষী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চলমান সংগ্রামের অমোঘ দৃষ্টান্ত। আমি তাকে চিনি এবং জানি—আজ থেকে তিন দশক আগে থেকেই তার সাহস, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। মিজানুর রহমান চৌধুরী একজন দেশের অমূল্য সম্পদ। আজ তিনি মাত্মকভাবে অসুস্থ এবং তার চিকিৎসার জন্য প্রায় কোটি কোটি টাকার প্রয়োজন। তিনি এমন একজন সাংবাদিক, যাঁর কাছে জমানো কোনো ব্যক্তিগত অর্থ নেই—আজীবন তিনি নিজের পকেট থেকে দিয়েছেন গরীব, দুঃখী এবং নিপীড়িত মানুষের জন্য। তাঁর জীবন দর্শন ও কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে—সাংবাদিকতা কখনো ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়; এটি মানুষের অধিকার, ন্যায় এবং দেশের সেবার প্রতীক। এখন সময় এসেছে সরকারের, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সমাজের সচেতন জনগণকে এগিয়ে আসার। মিজানুর রহমান চৌধুরীর উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া আবশ্যক। রাষ্ট্রের আন্তরিক দৃষ্টি ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। তার অবদান এবং সাহসী সাংবাদিকতা দেশের ইতিহাসে চিরকাল অম্লান থাকবে—এটি নিশ্চিত। তিনি প্রমাণ করেছেন—সত্য বলার সাহস, নৈতিক দৃঢ়তা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা হল সেই গুণ যা একজন সাংবাদিককে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিভূ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। আজকের দিনে, যখন অনেক সাংবাদিক রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক প্রলোভন বা ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে পিছিয়ে যাচ্ছেন, মিজানুর রহমান চৌধুরী আমাদের মনে করিয়ে দেন—সত্যের পথে দাঁড়ানো কখনো হারায় না। তিনি প্রমাণ করেছেন—সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়; এটি মানুষের স্বাধীনতা, ন্যায় এবং দেশের জন্য অক্লান্ত সংগ্রামের প্রতীক। তার জীবন আমাদের শেখায়—আপোষহীনতা, সততা এবং সাহসী মনোবল একমাত্র সত্যিকারের সাংবাদিকতার পরিচয়। সাংবাদিক মিজানুর রহমান চৌধুরীর নাম ইতিহাসে চিরকাল অম্লান থাকবে। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, সাহসী সাংবাদিকতা শুধু সংবাদ প্রকাশ নয়; এটি সমাজ, দেশ এবং মানবতার প্রতি সর্বোচ্চ দায়বদ্ধতার জীবন্ত প্রতীক। আজও তার লড়াই এবং সাহস নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের প্রেরণা দিচ্ছে। তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আমরা চাই, রাষ্ট্র যেন তার স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে, যাতে তিনি আবারও আমাদের দেশের জন্য সৎ সাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারেন।