‘অপরিকল্পিত নগর’।আলোচিত- সমালোচিত দু’টি শব্দ। শব্দ দুটি জনপ্রিয় না হলেও বহুল ব্যবহার হয় তাতে কোন সন্দেহ নেই। অপরিকল্পিত নগরের যন্ত্রণা নিয়ে কবিতা আছে,গল্প আছে, প্রবন্ধ আছে, উপন্যাস আছে,নাটকও আছে।অপরিকল্পিত নগরের কষ্ট নিয়ে সেমিনার হয়, টক শো হয়, গলাবাজি হয়, বক্তৃতাবাজিও হয়। অপরিকল্পিত নগরে বসবাসরত মানুষের সমস্যা নিয়ে সাংবাদিকেরা কথা বলেন, বুদ্ধিজীবীরা কথা বলেন, সম্মানিত শিক্ষকরা কথা বলেন, নগর পরিকল্পনাবিদরা কথা বলেন, সচেতন মানুষ কথা বলেন, সুশীল সমাজ কথা বলেন,সাধারণ মানুষ কথা বলেন। কথা বলেন না — এমন কাউকে খুঁজেই পাওয়া যাবে না। কিন্তু যে লাউ, সেই কধু। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। ফলে অপরিকল্পিত নগরের পরিধি বাড়ছে, বাড়ছে অপরিকল্পিত নগরের সংখ্যা। এ কারণে নগরবাসী মানুষের জীবনের দূর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে। বিষাক্ত হয়ে উঠছে পরিবেশ। বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠেছে নগরগুলো ।
মাঝে মধ্যে অপরিকল্পিত নগরকে পরিকল্পিত নগরে পরিণত করার জন্য নানামুখী কাজের আয়োজন করা হয়। কিন্তু এসব কাজ বেশির ভাগ সময় জনগণের জন্য বিপরীত ফল নিয়ে আসে। এর কারণ বহুবিধ। তবে প্রধান কারণ হচ্ছে, শুরুটা আমরা ঠিক মত শুরু করতে পারিনি। ঠিক মত শুরু করতে পারিনি বলেই আমাদেরকে কঠিন সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। আমাদের বর্তমান নগরগুলো যখন নগর হওয়ার পথে হাঁটা শুরু করেছিল, তখন যদি আমরা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাকে সামনে রেখে কাজ আরম্ভ করতাম, তাহলে আমাদের নগরগুলো হত সুন্দর, সমৃদ্ধ এবং পরিবেশ বান্ধব। এখন আমরা যতই পরিকল্পনা গ্রহণ করি না কেন, বেশিরভাগ মুমূর্ষু নগরকে সুস্থ নগরে পরিণত করা প্রায় অসম্ভব। ২.অপরিকল্পিত নগরের যন্ত্রণা , নগরে বসবাসরত মানুষের সমস্যা এবং অপরিকল্পিত নগরকে পরিকল্পিত নগরে পরিণত করার কথা বলতে বলতে সবাই হয়রান হয়ে গেছেন । এবার আমাদেরকে গ্রাম নিয়ে কথা বলতে হবে , গ্রাম নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা যদি গ্রাম নিয়ে না ভাবি, তাহলে নিকট ভবিষ্যতে পুরো বাংলাদেশই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। কারণ, আমাদের গ্রামগুলো অপরিকল্পিত শহরে পরিণত হওয়ার পথে হাঁটছে ।এই হাঁটা থামাতে না পারলে ২০৫০ সালের মধ্যে গ্রামগুলো অপরিকল্পিত শহরে পরিণত হবে। তাই সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক আমাদের জন্য উচ্চারণ করেছেন সতর্ক বাণী : ” প্রত্যেকটা শহর হচ্ছে একেকটি ক্যান্সার সেল।
২০৫০ সালের মধ্যে গ্রামগুলোও কথিত শহরের রূপ নেবে। তখন ক্যান্সার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়বে না। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি আর কোনো সরকারই ম্যানেজ করতে পারবে না।” অন্তত দশ বছর আগে আমাদের গ্রাম নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা দরকার ছিল ।দশ বছর আগে চিন্তা করলে আমরা যে ফল পেতাম,এখন চিন্তা করলে সে ফল পাব না।এমনকি এক বছর আগে চিন্তা করলে যে ফল পাওয়া যেত , এখন চিন্তা করলেও সে ফল পাওয়া যাবে না। তাই কাল বিলম্ব না করে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে নগর পরিকল্পাবিদদের সাথে সরকারের বসা উচিৎ। নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাবনার আলোকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে কাজ শুরু করার মাধ্যমে গ্রামগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হবে । থামাতে হবে গ্রামগুলোর ভুল পথে হাঁটা, থামাতে হবে গ্রামগুলোর অপরিকল্পিত উন্নয়ন। বাঁচাতে হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যত।