
মাননীয়,
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহা পরিচালক মোঃ হাসান মারুফ সমীপে,
শ্রদ্ধেয় মারুফ ভাইজানে,
গরম গরম কথার শুরুতে আমার লাখ কোটি সালাম জানিবেন। আশা করি আল্লাহ মালিকের অপার রহমতে ভালোই আছেন এবং দেশ ও জাতির কল্যাণে নিরলস কাজ করিয়া যাইতেছেন। আমিও এই মফস্বলের এক কোণে থাকিয়া দেশ, জাতি ও দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভাবিয়া ভাবিয়াই দিন যাপন করিয়া আসিতেছি। ঘুম আসে না, কারণ যাহা দেখিতেছি, তাহা দেখিয়া ঘুম আসিবার কথাও না ।
গত সপ্তাহে গলির এক মোড়ে দাঁড়াইয়া দেখিলাম, আমার প্রতিবেশীর ছেলে বয়স বড়জোর পনেরো হাতে একটি চকচকে যন্ত্র লইয়া মুখ দিয়া ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়াইতেছে। আমি জিজ্ঞেস করিলাম, “বাজান, এইটা কী?” সে হাসিমুখে বলিল, “চাচা, এইটা ভেপ। সিগারেটের চাইতে একদম সেইফ।” আমি বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম। বুকের ভেতর একটা চিনচিনে ব্যথা রহিয়া গেল। সেই ব্যথা হইতেই আজকের এই চিঠি।
ভাইজানরে,
খবর লইয়া জানিতে পারিয়াছি, ওই ছেলেটি মিথ্যা বলে নাই। সে যাহা শুনিয়াছে তাহাই বলিয়াছে। কিন্তু যাহারা তাহাকে এই কথা শিখাইয়াছে, তাহারা সত্য বলে নাই। ভেপ বা ই-সিগারেট “নিরাপদ” এই মিথ্যাটি এখন আমাদের দেশের আনাচে কানাচে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। বিদেশি কোম্পানির চকচকে বিজ্ঞাপন, ফলের সুবাসযুক্ত তরল, আর আধুনিকতার মোড়কে মোড়ানো এই বিষকে তরুণেরা ‘কুল’ বলিয়া গ্রহণ করিতেছে। কিন্তু বিজ্ঞান কী বলিতেছে? আসুন একটু শুনি।
ভাইজানরে,
ফুসফুসের কথা । ২০১৯ সালে আমেরিকায় হঠাৎ করিয়া হাজার হাজার তরুণ শ্বাসকষ্ট লইয়া হাসপাতালে ভর্তি হইতে লাগিল। ডাক্তাররা প্রথমে বুঝিতেই পারিলেন না কী হইতেছে। পরে জানা গেল, ইহার নাম EVALI ই-সিগারেট বা ভেপিং প্রোডাক্ট ইউজ অ্যাসোসিয়েটেড লাং ইনজুরি। আমেরিকার CDC’র হিসাব মতে, সেই বছরই দুই হাজারেরও বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হইয়াছিল এবং ষাটেরও বেশি মানুষ মারা গিয়াছিল। এই মৃতদের মধ্যে অনেকেই ছিল কুড়ি-পঁচিশ বছরের তরুণ।
জার্নাল অব দ্য আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গিয়াছে, ভেপের ভেতর থাকা ডায়াসিটাইল নামক রাসায়নিক পদার্থ ফুসফুসের ক্ষুদ্র বায়ুথলিগুলিকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইহার পোশাকি নাম ‘পপকর্ন লাং’ কারণ এই রোগটি আগে কেবল পপকর্ন কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে দেখা যাইত। এখন তাহা পাড়া কিংবা অলি গলির ছেলেদের ফুসফুসেও বাসা বাঁধিতেছে।একবার ভাবিয়া দেখুন, যে ফুসফুস একটি শিশুর জন্মের পর হইতে বিশ বছর ধরিয়া গড়িয়া উঠে, তাহাকে আমরা একটি চকচকে যন্ত্রের ধোঁয়ায় নষ্ট করিয়া দিতেছি। এইবার বলিব ‘হৃদয়ের কথা’।
ভাইজানরে,
ভাইজানরে,
এইটা শুনিলে হয়তো আপনিও চমকাইবেন। নেচার নিউরোসায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গিয়াছে, মানুষের মস্তিষ্ক পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত বিকশিত হইতে থাকে। এই সময়ে মস্তিষ্কে নিকোটিন প্রবেশ করিলে তাহা স্মরণশক্তি, মনোযোগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের জায়গাগুলিকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করিয়া দেয়। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকরা দেখিয়াছেন, কিশোর বয়সে নিকোটিনের সংস্পর্শে আসা মস্তিষ্কে পরবর্তীতে বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যা অনেক বেশি দেখা দেয়।
এর মানে কী দাঁড়াইল? যে ছেলেটি আজ পড়ার টেবিলে বসিয়া ভেপ টানিতেছে, সে কেবল আজকের পরীক্ষায় খারাপ করিতেছে না, সে তাহার সমগ্র জীবনের চিন্তা করিবার ক্ষমতাকে ক্ষয় করিয়া দিতেছে।’আসক্তির কথা’ আর কী বলিব ?
ভাইজানরে,
একটি কথা আজকাল অনেক ছেলেমেয়েই বলিয়া থাকে ‘আমি যখন চাহিব তখনই ছাড়িতে পারিব।’ এই কথাটি শুনিলে মনে পড়ে সেই প্রবাদ নদীতে নামিবার আগে স্রোত বোঝা যায় না।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০ সালের গবেষণায় দেখা গিয়াছে, ভেপের নিকোটিন সাধারণ সিগারেটের চাইতে অনেক দ্রুত মস্তিষ্কে পৌঁছায় এবং আসক্তি তৈরী করে। জনপ্রিয় JUUL ব্র্যান্ডের একটি পড-এ নিকোটিনের পরিমাণ প্রায় বিশটি সাধারণ সিগারেটের সমান। অথচ ছেলেমেয়েরা একটি পড এক বা দুই দিনেই শেষ করিয়া ফেলে। ইহা আসক্তি নহে তো কী? আমাদের দেশের কথা বলি ।
ভাইজানরে,
বিদেশের গবেষণার কথা শুনিলাম। এইবার একটু ঘরের কথা বলি।
আমাদের দেশে ভেপ বিক্রির উপর কোনো কঠোর নিয়ন্ত্রণ নাই। যেখানে চকলেট বিক্রি হয়, সেখানেই ভেপের কার্টিজ পাওয়া যায়। বয়স জিজ্ঞেস করে না কেউই , লাইসেন্সের বালাই নাই, রাস্তার পাশের দোকান হইতে শুরু করিয়া অনলাইনে ক্লিক করিলেই ঘরে আসিয়া পৌঁছাইয়া যায়। ফলে চতুর্দশ বছরের একটি বালকও সহজেই ইহা কিনিতে পারিতেছে। আর অভিভাবকেরা? তাহারা বুঝিতেই পারিতেছেন না। কারণ ভেপের ধোঁয়ায় সিগারেটের মতো গন্ধ নাই বরং স্ট্রবেরি বা আমের সুবাস আসে। মা মনে করেন ছেলে হয়তো কোনো মিষ্টি খাইতেছে। এই সুবাসটাই আসলে সবচাইতে বড় ফাঁদ।
ভাইজানরে,
আপনি কিছুু পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে পারেন প্রথমত, ভেপ ও ই-সিগারেট বিক্রিতে কঠোর বয়সসীমা আরোপ করুন এবং যাচাইয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। দ্বিতীয়ত, স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমে ভেপের স্বাস্থ্যক্ষতি বিষয়ে সচেতনতামূলক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করুন কেবল বই নহে, শ্রেণিকক্ষে আলোচনাও হোক। তৃতীয়ত, অনলাইনে ভেপ বিক্রির বিষয়ে নজরদারি বাড়ান এবং অবৈধ আমদানি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিন। চতুর্থত, মা-বাবাদের জন্য আলাদা সচেতনতা কর্মসূচি চালু করুন যাহাতে তাহারা সন্তানের হাতের যন্ত্রটি চিনিতে পারেন। পঞ্চমত, বিজ্ঞাপনে যে মিথ্যা ‘নিরাপদ’ তকমাটি লাগানো হইতেছে, তাহার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিন।
ভাইজানরে ,
পাড়ার সেই পনেরো বছরের ছেলেটির কথা মনে পড়িতেছে। তাহার ভুল নাই। সে কেবল একটি ভুল তথ্যের শিকার। সঠিক তথ্য, সঠিক আইন আর সঠিক সচেতনতা থাকিলে সে হয়তো সেদিন ভেপের বদলে বইটাই হাতে তুলিয়া লইত। আমাদের ছেলেমেয়েরা এই দেশের ভবিষ্যৎ। তাহাদের হাতে ভেপ নহে, বই থাকুক। তাহাদের মুখে ধোঁয়া নহে, স্বপ্নের কথা থাকুক। এই বিষয়ে বাস্তব পদক্ষেপ লইবার আপনিই যোগ্য লোক । তাই আপনাকে এইসব বলিতেছি।
এই প্রত্যাশায় আজ আর না । আপনার সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনায় ইতি আপনারই গ্রাম বাংলার অখ্যাত ঠান্ডা মিয়া ম. আ. হ
তারিখ: ৬ জুন ২০২৬
আগামী সংখ্যায় চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম সমীপে ঠান্ডা মিয়ার গরম কথা (৩৬০) সম্প্রচার করা হইবে।