1. [email protected] : purbobangla :
মঙ্গলবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২২, ০১:১১ অপরাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ :
বঙ্গবন্ধু টানেলের সুফলের বদলে সংকট যানজট বাড়ার শঙ্কা চট্টগ্রাম গ্রামীণ চক্ষু হাসপাতালের ‘চক্ষু শিবির’ মানুষের মাঝে ছড়াচ্ছে আশার আলো ২৯নং ওয়ার্ডে এ.বি.এম. মহিউদ্দীন চৌধুরী পরিবারের পক্ষ থেকে শীত বস্ত্র বিতরণ গাউসিয়া কমিটি দুবাই আল আবীর শাখার দোয়া মাহফিল সৈয়দ মঈনুদ্দিন হোসেন মেমোরিয়াল একাডেমি কাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্টে ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমি  ও ব্রাইট একাডেমি চ্যাম্পিয়ন গাজীপুর জেলা ক্রীড়া অফিসের আয়োজনে অটিজম ছেলে-মেয়েদের ক্রীড়া উৎসব অনুষ্ঠিত চট্টগ্রামের প্রথম বেকিং ট্রেনিং সেন্টার ও শোরুমের যাত্রা শুরু  কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ভূমিকম্পে কাঁপলো এশিয়ার ৬ দেশ শ্রমিকরা অর্থনীতির আয়না : শাজাহান খান নবাবগঞ্জে করোনার ভ্যাকসিন দিতে গিয়ে স্কুল ছাত্রের মৃত্যু

সিআরবি: প্রাকৃতিক অক্সিজেন প্ল্যান্ট

Reporter Name
  • Update Time : শুক্রবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২১
  • ২০ Time View

ইসমাইল হোসেন চৌধুরী

সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং (সিআরবি) চট্টগ্রাম শহরের কোতোয়ালী থানার অধীনে টাইগারপাস সংলগ্ন পাহাড়ী এলাকায় অবস্থিত। এটি বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপকের কার্যালয়। ১৮৭২ সালে নির্মিত ভবনটি বন্দর নগরীর প্রাচীনতম ভবন। এর পূর্বদিকে সিআরবি সড়ক জুড়ে রয়েছে রেলওয়ে হাসপাতাল যা ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সিআরবির পার্শ্ববর্তী স্থানে রেল কর্মকর্তাদের জন্য একটি আবাসিক এলাকাও গড়ে উঠেছে। সিআরবি মূলত ছোট-বড় অসংখ্য বৃক্ষরাজির সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রাকৃতিক সবুজ বলয়। এতে আছে পাহাড়, শতবর্ষী বৃক্ষরাজি, হাতির বাংলো, শিরীষতলা নামে একটি প্রশস্ত মাঠ; যেখানে
প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফাল্গুন ইত্যাদি ঐতিহ্যগত উৎসব আয়োজন করে নগরবাসী।
সিআরবি নিয়ে এখন তুমুল আলোচনা। কারণ এখানে ৬ একর জায়গা জুড়ে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের সাথে চুক্তি করেছে ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এখানে একটি ৫০০ শয্যার হাসপাতাল তৈরি করবেন তারা। হাসপাতাল নির্মাণের কথাটি জেনেই প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন পরিবেশবাদী সংগঠন, সংস্কৃতিকর্মী, সাধারণ নাগরিক এবং নগর পরিকল্পনাবিদরা। কারণ হাসপাতাল নির্মাণের জন্য নির্ধারিত স্থানে রয়েছে শতবর্ষী গাছ। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলেছে, গাছের কোনো ক্ষতি না করেই এখানে হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি অসম্ভব। এখানে হাসপাতাল হলে কাটা পড়বে শতবর্ষী গাছসহ ছোট বড় অসংখ্য বৃক্ষরাজি। হুমকির মুখে পড়বে এখানকার জীববৈচিত্র্য। এসব কারণে সিআরবিকে বলা হয় চট্টগ্রামের ফুসফুস। বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন থেকে এ সিদ্ধান্ত যে কতবড় ক্ষতির কারণ হতে পারে, তা ইকো নামে একটি বেসরকারি সংগঠন তাদের গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের বিশিষ্ট উদ্ভিদবিজ্ঞানী ড. ওমর ফারুক রাসেলের নেতৃত্বে সম্পন্ন গবেষণায় দেখা যায়, সিআরবি হিলে প্রায় ১৯৭টি উদ্ভিদ প্রজাতি আছে। তার মধ্যে ১৩৫টি হচ্ছে ঔষধিগাছ। পাঁচটি প্রজাতি বিপন্নপ্রায়। চারটি প্রজাতি যদি এখনই সংরক্ষণ করা না হয়, তাহলে সেটি অচিরেই হারিয়ে যাবে। গবেষণায় দেখা গেছে, ছয় একর জায়গাজুড়ে যদি হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়, তাহলে প্রায় ৭০টি ছোট ও মাঝারি আকারের উদ্ভিদ প্রজাতি একেবারেই ধ্বংস হয়ে যাবে। অর্থাৎ শুধু শতবর্ষী গাছ নিয়ে আমরা কথা বলছি, কিন্তু ছোট এবং মাঝারি আকারের যে দেশজ উদ্ভিদ প্রজাতি আছে, সেগুলোও এ হাসপাতাল নির্মাণের কারণে প্রায় ধ্বংস হয়ে যাবে। ফলে সিআরবির যে ইকো সিস্টেম এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর খাদ্যচক্র সেটাও পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।
উদ্ভিদ বিজ্ঞানে সালোকসংশ্লেষণ কথাটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সালোক শব্দটির অর্থ হলো-সূর্যালোকের উপস্থিতি, আর সংশ্লেষণ শব্দটির অর্থ- কোনো কিছু উৎপাদিত হওয়া। এক কথায় সালোকসংশ্লেষণ এর অর্থ দাঁড়ায় সূর্যালোকের উপস্থিতিতে রাসায়নিক সংশ্লেষ। যে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সবুজ উদ্ভিদ কোষে সূর্যালোকের উপস্থিতিতে পরিবেশ থেকে গৃহীত কার্বন ডাইঅক্সাইড ও মূল দ্বারা শোষিত জলের বিক্রিয়ায় শর্করা জাতীয় খাদ্যের সংশ্লেষ ঘটে এবং গৃহীত কার্বন ডাইঅক্সাইডের সমপরিমাণ অক্সিজেন প্রকৃতিতে নির্গত হয়, তাকে সালোকসংশ্লেষণ বলে। সহজ কথায়, সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদ পরিবেশ থেকে কার্বন ডাই আক্সাইড গ্রহণ করে সমপরিমাণ আক্সিজেন উৎপন্ন করে এবং তা আমাদের জন্য সরবরাহ করে। পরিবেশে কার্বন ডাই আক্সাইড গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি আমাদের জন্য অশ্বস্থিকর। আর সেই কার্বন ডাই আক্সাইড গ্যাস শোষণ করে উদ্ভিদ। অক্সিজেন ছাড়া মানুষ তথা প্রাণীজগতের বেঁচে থাকা অসম্ভব। আর এই অক্সেজেন্ আমাদের জন্য তৈরী এবং সরবরাহ করে উদ্ভিদ। অতএব উদ্ভিদই হচ্ছ একমাত্র অক্সিজেন তৈরীর প্রাকৃতিক প্ল্যান্ট।

অন্যদিকে, আমরা জানি কোনো স্থাপনার বয়স সাধারণত ১০০ বছর হয়ে গেলে এবং সেটিতে যদি পাবলিক ইন্ট্রেস্ট থাকে তাহলে সেই জায়গাটিকে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সিআরবির বয়স এখন ১৪৯ বছর। প্রত্নতত্ত্ব আইনে বলা হয়েছে, ১০০ বছরের পুরনো হলে কোনো স্থাপনা প্রত্নতত্ত্ব আইনে বিবেচিত হবে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এটি একটি পাবলিক প্লেস এবং এখানে একটি সাংস্কৃতিক মঞ্চ রয়েছে। সবকিছু বিবেচনায় সিআরবি এখন হেরিটেজ।
সাধারণভাবেও যদি আমরা এ প্রকল্পকে বিবেচনা করি, তাহলে এটা হবে একটি মারাত্মক বৃক্ষবৈচিত্র্য বিধ্বংসী প্রকল্প। এটা খুবই স্বাভাবিক যে ৫০০ বেডের হাসপাতাল, ১০০ আসনের মেডিকেল কলেজ এবং ৫০ আসনের নার্সিং ইনস্টিটিউট যদি এখানে করা হয়, তাহলে সেটাকে কেন্দ্র করে আশপাশে গড়ে উঠবে বিভিন্ন ধরনের দোকান, ছোটখাটো বাজার, মার্কেটপ্লেস, আবাসন, ফার্মেসি, হোটেলরেস্তোরা, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং বিভিন্ন ধরনের ছোট ছোট স্থাপনা যা সিআরবি হিলের পুরো পরিবেশকেই যে ধ্বংস করবে।
চট্টগ্রামকে যে বীর চট্টলা বলা হয়, তার পেছনেও রয়েছে সিআরবি হিলের গৌরবোজ্জ্বল সম্পৃক্ততা।ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এই সিআরবি হিলের এলাকাই ছিল বিপ্লবীদের গোপন মিলন স্থান। এ পাহাড়তলীতে বসেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নানান পরিকল্পনা হয়েছিল। অথচ দুঃখজনক হচ্ছে, তার কোনো স্মৃতিচিহ্নই এখানে নেই। এ ছাড়া হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাবিত স্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের প্রথম নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আবদুর রবের কবর। এই সিআরবিতেই অনেকে শহীদ হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। রেলওয়ের অনেক শ্রমিক লেমুক্তিযুদ্ধে জীবন দিয়েছেন। ফএই সিআরবি হিল মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এলাকা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পর যেখানে স্বাধীনতার গৌরবগাথা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা একটি অত্যাবশ্যকীয় কাজ হওয়ার কথা, সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত এবং ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবের গৌরবমাখা সিআরবি হিল এলাকাকে ধ্বংস করে হাসপাতাল নির্মাণের চিন্তা ও পরিকল্পনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
হাসপাতাল নাকি সবুজ বলয়, কোনটা জরুরি? এটি কোনো প্রশ্ন হতে পারে না।হাসপাতাল অবশ্যই দরকার। এখানে কোনো প্রশ্ন অথবা শর্ত দেয়া অবান্তর। কিন্তু একটি সবুজ বলয়কে আঘাত করে হাসপাতাল নয়। আর সিআরবির মতো সবুজ বলয় দীর্ঘসময় জুড়ে নানা বয়সী মানুষের শরীর ও মনের সুস্থতায় বিনামূল্যে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখছে। নগর পরিকল্পনায় আমরা পরিবেশ প্রসঙ্গ গুরুত্ব দেই না। আদতে নগর পরিকল্পনায় সবচে কম গুরুত্ব পায় মানুষ। কারণ মানুষ পরিবেশের এক সংবেদনশীল অংশ। অথচ যে নগর গড়ে ওঠে চারিধারে সে নগরে মানুষের পরিকল্পনা কোথায়? মানুষের জন্যই নগর। এখানে পাখিও থাকবে, গাছ, জলাশয়, বন্যপ্রাণী আর সবার সঙ্গে মিলিয়ে থাকবে মানুষ। চট্টগ্রামের সিআরবি একটি অতি খুদে নমুনা মাত্র। সিআরবিকে আরও বেশি সুরক্ষিত করা জরুরি। এর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য বিকাশ ও সুরক্ষায় দরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।একইসাথে সিআরবির মতো দেশের সকল অঞ্চলের প্রাচীন উদ্যান ও সবুজ বলয়গুলোর তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন। এসব সবুজ বলয় বিকাশ ও সুরক্ষিত রাখতে পরিকল্পনা গ্রহণও জরুরি। আসুন সবাই মিলে সিআরবিকে আগলে দাঁড়াই।সিআরবির প্রাকৃতিক অক্সিজেন তৈরীর প্রাকৃতিক প্ল্যান্ট সুরক্ষিত রেখে হাসপাতাল নির্মাণে উদ্যোগী হই। লেখক পরিবেশ কর্মী ও প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2021 purbobangla